
প্রতি বছর ১২ জুন বিশ্ব শিশুশ্রম দিবস পালিত হয়!বাংলাদেশ সরকারের শ্রম ও কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়ের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী ১২ জুনের পরিবর্তে ২৯ জুন পালিত হচ্ছে!
প্রতি বছর এই দিনটি যখন ফিরে আসে, তখন আমাদের সামনে ভেসে ওঠে কিছু চেনা অথচ বেদনাবিধুর দৃশ্য। যে বয়সে একটি শিশুর হাতে থাকার কথা ছিল রঙিন বই আর খাতা, সেই বয়সে বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে অসংখ্য শিশুর হাতে শোভা পায় লেদ মেশিনের গ্রিজ, চায়ের দোকানের কেটলি, কিংবা ময়লা ফেলার বস্তা।
বাংলাদেশের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ও উন্নয়নের জাঁকজমকপূর্ণ গল্পের আড়ালে শিশুশ্রম এখনো একটি রূঢ় এবং নির্মম বাস্তব।
বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে শিশুশ্রমের বর্তমান চিত্র
বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরো (BBS) এবং আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থার (ILO) বিভিন্ন জরিপ অনুযায়ী, বাংলাদেশে এখনো কয়েক মিলিয়ন শিশু নানা ধরনের শ্রমে নিয়োজিত। এর মধ্যে একটি বড় অংশই নিয়োজিত রয়েছে ঝুঁকিপূর্ণ শিশুশ্রমে।
আমাদের চারপাশে তাকালেই এই চিত্রগুলো স্পষ্ট হয়ে ওঠে:
ধোঁয়াশাচ্ছন্ন গ্যারেজ ও কারখানায়: ওয়েল্ডিংয়ের বিপজ্জনক আলোর নিচে কিংবা লেদ মেশিনের কালির মাঝে শৈশব হারাচ্ছে হাজারো শিশু।
পথশিশু ও টোকাই: ইটভাটায় ভারী ইট মাথায় তোলা, ডাস্টবিন থেকে প্লাস্টিক কুড়ানো কিংবা তপ্ত রোদে ট্রাফিক সিগন্যালে ফুল বা জিনিসপত্র বিক্রি করা।
গৃহশ্রম: বাসাবাড়িতে গৃহকর্মী হিসেবে কাজ করা শিশুরা প্রায়শই অদৃশ্য এবং সব ধরনের অধিকার থেকে বঞ্চিত। অনেক ক্ষেত্রে তারা শারীরিক ও মানসিক নির্যাতনের শিকারও হয়।
শিশুশ্রমের মূল কারণসমূহ
বাংলাদেশে শিশুশ্রমের পেছনে কোনো একক কারণ নেই, বরং এটি একটি বহুমাত্রিক সংকট:
চরম দারিদ্র্য: অনেক দরিদ্র পরিবারে শিশুর সামান্য আয়ও টিকে থাকার বড় অবলম্বন হয়ে দাঁড়ায়। বাবা-মায়ের অস্বচ্ছলতার কারণেই শিশুরা পড়াশোনা ছেড়ে কাজে নামতে বাধ্য হয়।
সচেতনতার অভাব ও পারিবারিক ভাঙন: শিক্ষার দীর্ঘমেয়াদি সুফল সম্পর্কে অনেক অভিভাবকের অসচেতনতা এবং পারিবারিক কলহ বা বাবা-মায়ের বিচ্ছেদের কারণে শিশুরা অরক্ষিত হয়ে পড়ে।
সস্তা শ্রমের চাহিদা: অনৈতিক ব্যবসায়ী এবং নিয়োগকর্তারা শিশুদের কম মজুরিতে দীর্ঘক্ষণ খাটাতে পারে এবং শিশুরা সহজে প্রতিবাদ করতে পারে না বলে তাদের নিয়োগ দিতে বেশি পছন্দ করে।
আইনি কাঠামো ও সরকারি উদ্যোগ
বাংলাদেশ সরকার শিশুশ্রম নিরসনে বেশ কিছু প্রশংসনীয় পদক্ষেপ নিয়েছে। জাতীয় শিশুশ্রম নিরসন নীতি প্রণয়ন করা হয়েছে এবং ২০২৫ সালের মধ্যে দেশ থেকে সব ধরনের শিশুশ্রম (বিশেষ করে ঝুঁকিপূর্ণ শ্রম) নির্মূল করার একটি জাতীয় লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছিল। এছাড়া শ্রম আইন অনুযায়ী নির্দিষ্ট বয়সের নিচে শিশুদের ভারী বা ঝুঁকিপূর্ণ কাজে নিয়োগ দেওয়া দণ্ডনীয় অপরাধ।
তবে আইন থাকা সত্ত্বেও মাঠপর্যায়ে এর যথাযথ প্রয়োগ এবং কঠোর নজরদারির অভাবে এখনো শিশুশ্রম পুরোপুরি বন্ধ করা সম্ভব হয়নি।
আমাদের করণীয়: কেবল একটি দিন নয়, হোক প্রতিদিনের অঙ্গীকার
শিশুশ্রম প্রতিরোধ দিবস শুধু ক্যালেন্ডারের একটা দিন উদযাপনের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকলে চলবে না। টেকসই উন্নয়নের (SDG) লক্ষ্যমাত্রা অর্জন করতে হলে আমাদের সম্মিলিত প্রচেষ্টা প্রয়োজন:
"আজকের শিশুই আগামী দিনের ভবিষ্যৎ—এই বাণীকে স্লোগানের মধ্যে বন্দি না রেখে বাস্তবতায় রূপ দিতে হবে।"
দরিদ্র পরিবারগুলোকে সহায়তা: সামাজিক নিরাপত্তা বেষ্টনীর আওতা বাড়িয়ে দরিদ্র পরিবারগুলোকে আর্থিক ও কর্মসংস্থানের সহায়তা দিতে হবে, যেন তারা সন্তানকে কাজে না পাঠিয়ে স্কুলে পাঠাতে পারে।
বাধ্যতামূলক ও মানসম্মত প্রাথমিক শিক্ষা: ঝরে পড়া রোধ করতে সরকারি ও বেসরকারি উদ্যোগে সুবিধাবঞ্চিত ও পথশিশুদের জন্য অবৈতনিক এবং বৃত্তিমূলক শিক্ষার ব্যবস্থা জোরদার করতে হবে। এই লক্ষ্যে ওয়ার্ল্ড ভিশন বাংলাদেশ সারা বাংলাদেশে শিশুশ্রম মুক্ত ঘোষণার লক্ষ্যে এ পর্যন্ত সাতটি উপজেলাকে শিশু মুক্ত এলাকা হিসেবে ঘোষণা করেছে স্থানীয় সরকারের সহযোগিতায়।
সচেতনতা ও সামাজিক বয়কট: বাসাবাড়িতে বা কলকারখানায় শিশুশ্রম ব্যবহার বন্ধে আমাদের নিজেদের মানসিকতা বদলাতে হবে। শিশুশ্রমকে 'না' বলার সাহস ও মানসিকতা সমাজজুড়ে তৈরি করতে হবে।
উপসংহার
একটি শিশুর শৈশব কেড়ে নেওয়া মানে একটি জাতির ভবিষ্যৎ পঙ্গু করে দেওয়া। ২৯ই জুনের এই বিশেষ দিনে বাংলাদেশের প্রতিটি নাগরিক, সুশীল সমাজ এবং সরকারের একটাই অঙ্গীকার হওয়া উচিত—আইনের কঠোর প্রয়োগ এবং মানবিকতার হাত বাড়িয়ে প্রতিটি শিশুর জন্য একটি নিরাপদ, সুরক্ষিত এবং শিক্ষাবান্ধব পরিবেশ নিশ্চিত করা। প্রতিটি শিশুর হাত হোক কলমের, হাতুড়ির নয়।