নিজস্ব সংবাদদাতা
নানাবিধভাবে শিশু অধিকার বঞ্চিত হবার ক্ষেত্রে “বাল্যবিবাহ”, “শিশুশ্রম” দু’টি অন্যতম উৎস হিসেবে পরিলক্ষিত আজ বিভিন্ন মহলে। বিশেষ করে উন্নয়ন সেক্টরে “বাল্যবিবাহ” ও “শিশুশ্রম” যেন দু’টি সমন্বিত সমস্যার নাম। “শিশুশ্রমকে না বলি” এবং “আমার উপজেলা, আমার দায়িত্ব, শিশুর জীবন হোক বাল্যবিাহমুক্ত”- এমন একটি শ্লোগানকে সামনে রেখে আজ ২১ জুলাই ২০২৫ নেত্রকোণা জেলার পূর্বধলা উপজেলাকে বাল্যবিবাহমুক্ত উপজেলা ও ৩টি ইউনিয়নকে (আগিয়া, খলিশাউর. জারিয়া) শিশুশ্রমমুক্ত হিসেবে ঘোষণা করা হয়। যৌথভাবে এই ব্যতিক্রমী অনুষ্ঠানের আয়োজন করে ‘গ্রাম উন্নয়ন সোসাইটি’, ‘শিশু ফোরাম’, ‘যুব ফোরাম’, ‘ধর্মীয়বৃন্দ’, ‘ইউনিয়ন পরিষদ’ ও ‘স্থানীয় সুশীল সমাজ’; যেখানে যৌথভাবে সহযোগিতা করে ‘ওয়ার্ল্ড ভিশন বাংলাদেশ’ ও ‘উপজেলা প্রশাসন, পূর্বধলা, নেত্রকোনা। শিশুর অধিকার রক্ষার লক্ষ্যে ‘বাল্যবিবাহমুক্ত’ ও ‘শিশুশ্রমমুক্ত’ দু’টি গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ হিসেবে পূর্বধলায় আজ আনুষ্ঠানিকভাবে আজকের প্রধান অতিথি ও অত্র উপজেলার নির্বাহি অফিসার জনাব রেজওয়ানা কবির এ ঘোষণা প্রদান করেন।
অনুষ্ঠানের শুরুতেই সিনিয়র ম্যানেজার প্রশান্ত নাফাক উপস্থিত সকলকে শুভেচ্ছা জ্ঞপন করেন। পরবর্তীতে এডভোকেসি কো-অর্ডিনেটর জনাব তানজিমুল ইসলাম, পুরো আয়োজনের উদ্দেশ্য, ‘বাল্যবিাহ’ ও ‘শিশুশ্রমের’ কুফলসহ উপস্থিত সকলের সামনে নানাবিধ প্রয়োজনীয় তথ্য ও উপাত্তসমূহ তলে ধরেন। এছাড়া, উপস্থিত সকলের নৈতিক দায়িত্বের গুরুত্ব সম্পর্কে বিশদভাবে তুলে ধরেন। আয়োজক গোষ্ঠী, পূর্বধলার স্থানীয় ধর্মীয়নেতৃবৃন্দ ও সরকারি-বেসরকারি বিভিন্ন স্টেকহোল্ডারসহ মোট ৩০০ জনের স্বত:স্ফুর্ত অংশগ্রহণ অনুষ্ঠানটিকে সাফল্যমন্ডিত করে তোলে।
“বাল্যবিবাহ”, “শিশুশ্রম” এর মতো এসব ক্ষতিকারক প্রথাসমূহ নির্মূলে উপজেলা নির্বাহি অফিসার এই গুরুত্বপূর্ণ ঘোষণা করেন। তিনি শিশুদের সুরক্ষা এবং তাদের ভবিষ্যৎ কল্যাণ নিশ্চিত করার জন্য সকলের সম্মিলিত প্রয়াসকে সাধূবাদ জানান। একই সাথে তিনি বলেন, “আজ থেকে এ উপজেলাকে ‘শিশুশ্রম’ ও ‘শিশুবিবাহ’ মুক্ত রাখতে প্রত্যেকের দায়িত্ব আরো অনেক বেশি দায়িত্ব বেড়ে গেলো”। এডভোকেসি কো-অর্ডিনেটরের বক্তব্যের সূত্র ধরে তিনি আরো বলেন, ‘শিশুশ্রম’ ও ‘শিশুবিবাহ’ প্রতিরোধে ওয়ার্ল্ড ভিশন ও সহযোগী সংস্থাসমূহ ইতোমধ্যে যে যুগোপযুগী পদক্ষেপসমূহ গ্রহণ করেছে তা সত্যিই অনুসরণীয়ই বটে। তিনটি ইউনিয়নকে শিশুশ্রম মুক্ত ঘোষণার পুর্বে ১৫১ জন ‘শিশুশ্রমিককে’ তারা কেবলই চিহ্নিতই করেননি বরং ইতোমধ্যে ২৫ জনকে স্কুলে ফিরিয়ে এনেছেন, এটি সত্যিই আনন্দের সংবাদ! এছাড়া ‘শিশু বিবাহ মুক্ত উপজেলা’ ঘোষণার পূর্বে ১২ থেকে ১৮ বছরের নীচে মেয়ে ও ১৪ থেকে ২১ বছরের নীচে ছেলেদের তালিকা সংগ্রহ করে। ‘শিশুবিবাহের’ সম্ভাব্য ঝুঁকিতে থাকা ২২৫৮৩ জন ছেলেমেয়ে ও তাদের অভিভাকদের সচেতন করে তোলার মাধ্যমে যে পুরো উপজেলা জুড়ে যে গনজাগরন সৃষ্টি হয়েছে তা সত্যিই আগামী দিনে সুফল বয়ে আনবে বলে তিনি বিশ্বাস করেন। উপস্থিত সকল সরকারি-বেসরকারি স্টেকহোল্ডারগণকে একত্রে কাজের এই গতিশীলতা বজায় রাখার আহ্বান করেন।
সম্মানিত উপজেলা মহিলা বিষয়ক কর্মকর্তা জনাব শারমীন শাহজাদী এই উদ্যোগের ভূয়সী প্রশংসা করেন। তিনি বলেন, ‘এব্যাপারে মহিলা ও শিশু বিষয়ক মন্ত্রণালয়’ খুবই তৎপর! শিশু বিবাহ বন্ধে ওয়া্র্ল্ড ভিশনের এই উদ্যোগ সত্যিই প্রশংসার দাবিদার। ভবিষ্যতে যে কোনো ধরণের সহযোগিতার জন্য তিনি প্রস্তুত থাকবেন বলে আশ্বাস প্রদান করেন।
পূর্বধলা থানার অফিসার ইনচার্জ (তদন্ত) সচেতনতা বৃদ্ধি, জনসাধারণের সমন্বিত উদ্যোগ এবং বাল্যবিবাহ প্রতিরোধে শক্তিশালী ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠার জন্য ব্যবহৃত ব্যাপক কৌশলগুলি বিস্তারিতভাবে তুলে ধরেন। তিনি এই দৃষ্টিভঙ্গি বাস্তবায়নে জড়িত সকলের নিষ্ঠার প্রশংসা করেন। ‘শিশুশ্রম’ ও ‘শিশুবিবাহ’ প্রতিরোধে যে কোনো ধরনের সহযোগিতা প্রদান করতে তিনি প্রস্তুত বলে উপস্থিত সকলকে আশ্বস্ত করেন।
অনুষ্ঠানে ধর্মীয় নেতাদের সক্রিয় অংশগ্রহণ এবং সমর্থনও দেখা যায়, যারা শিশুদের সুরক্ষা এবং তাদের অধিকার সমুন্নত রাখার ক্ষেত্রে ধর্মীয় তাৎপর্য সম্পর্কে বক্তব্য রাখেন। তাদের বক্তৃতা বাল্যবিবাহের বিরুদ্ধে বার্তাকে আরও জোরদার করে।
স্থানীয় প্রশাসনের প্রতিনিধিগণ মনে করেন, তাদের ইউনিয়নের বাল্যবিবাহমুক্ত মর্যাদা বজায় রাখার লক্ষ্যে উদ্যোগগুলির প্রতি অব্যাহত সমর্থনের প্রতিশ্রুতি দেন। এছাড়া যুব সদস্য অপূর্ব রায়ের উপস্থিতিতে তরুণদের উৎসাহী অংশগ্রহণ স্পষ্ট ছিল, যা শিশুদের জন্য একটি উজ্জ্বল, নিরাপদ ভবিষ্যতের প্রতি পরবর্তী প্রজন্মের প্রতিশ্রুতির ইঙ্গিত দেয়।
‘শিশুশ্রম মুক্ত ইউনিয়ন’ ও ‘শিশুবিবাহ মুক্ত উপজেলার’ পৃথক দু’টি ঘোষণাপত্র পূর্বধলা উপজেলার জনগণের জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ মুহূর্ত হিসেবে চিহ্নিত হয়েছে যা নেত্রকোণা জেলার অন্যান্য উপজেলার জন্য একটি অনুসরণীয় উদ্যোগ হিসেবে বিবেচিত হয়েছে। এটি সত্যি প্রমানিত হয়েছে যে, ‘বিভিন্ন স্টেকহোল্ডাররা যখন একটি নির্দিষ্ট লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য বাস্তবায়নে সমন্বিত উদ্যেগ গ্রহণ করে, তখন যে কোনো চ্যালেন্জকে অতিক্রম করা সম্ভব, আজকের বর্ণাঢ্য আয়োজন তারই উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত!
“নিশ্চয়ই ‘শিশুশ্রম’ ও ‘বাল্যবিবাহের’ কড়াল গ্রাস থেকে মুক্ত হয়ে প্রতিটি শিশুর উন্নতির সুযোগ নিশ্চিত হবে একদিন!”- এমন একটি স্বপ্ন বাস্তবায়নে সরকারি-বেসরকারি স্টেকহোল্ডারের পাশাপাশি ‘জেলা শিশু কল্যাণ ও এডভোকেসি নেটওয়ার্ককে’ সাথে নিয়ে আগামী নিয়ে এই সামাজিক আন্দোলন অব্যাহত থাকবে, এই আশা ব্যক্ত করে সভাপতি হিসেবে সিনিয়র ম্যানেজার প্রশান্ত নাফাক তার সমাপনী বক্তব্য প্রদান করেন ও আজকের এই বর্ণাঢ্য অনুষ্ঠানের সমাপ্তি ঘটে!