রাজু উইলিয়াম রোজারিও
সমাজে নারী-পুরুষ ও অন্যান্য লিঙ্গ পরিচয় সম্পর্কে দীর্ঘদিন ধরে গড়ে ওঠা ধারণা, মানসিকতা ও ক্ষমতার কাঠামোর মৌলিক পরিবর্তনকেই বলা হয় জেন্ডার প্যারাডাইম শিফট। সহজভাবে বলতে গেলে, এটি এমন এক সামাজিক রূপান্তর যেখানে প্রথাগত লিঙ্গভিত্তিক বৈষম্য থেকে বেরিয়ে এসে সমতা, ন্যায়, অন্তর্ভুক্তি ও মানবিক মর্যাদার ভিত্তিতে নতুন চেতনার বিকাশ ঘটে। এই পরিবর্তন কেবল আইন প্রণয়ন বা নীতিমালার সংশোধনে সীমাবদ্ধ নয়; বরং পরিবার, শিক্ষা, কর্মসংস্থান, সংস্কৃতি, ধর্মীয় ব্যাখ্যা, রাজনৈতিক কাঠামো এবং অর্থনৈতিক সম্পর্ক—সব ক্ষেত্রেই গভীর প্রভাব ফেলে।
একসময় সমাজে নারীর পরিচয় প্রধানত ‘গৃহিণী’, ‘সহধর্মিণী’ কিংবা ‘নির্ভরশীল’ হিসেবে নির্ধারিত ছিল। পুরুষ ছিলেন উপার্জনকারী, সিদ্ধান্তগ্রহণকারী ও ক্ষমতার কেন্দ্রবিন্দু। এই ভূমিকা-বণ্টনকে স্বাভাবিক ও অপরিবর্তনীয় মনে করা হতো। কিন্তু সময়ের পরিবর্তনের সঙ্গে শিক্ষা বিস্তার, গণমাধ্যমের বিকাশ, মানবাধিকার চর্চা ও অর্থনৈতিক বাস্তবতার পরিবর্তনে সেই ধারণা প্রশ্নের মুখে পড়ে। নারীরা যখন উচ্চশিক্ষায় অগ্রসর হলো, কর্মক্ষেত্রে প্রবেশ করল, নেতৃত্বের আসনে বসল—তখন স্পষ্ট হলো যে সক্ষমতা লিঙ্গনির্ভর নয়। এখান থেকেই শুরু হয় দৃষ্টিভঙ্গির পরিবর্তন, অর্থাৎ জেন্ডার প্যারাডাইম শিফট।
এই পরিবর্তনের ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট বোঝার জন্য প্রতি বছর ৮ মার্চ পালিত International Women's Day-এর ইতিহাস গুরুত্বপূর্ণ। ১৯০৯ সালে যুক্তরাষ্ট্রে প্রথম জাতীয় নারী দিবস পালিত হয়। ১৯১০ সালে কোপেনহেগেনে আন্তর্জাতিক নারী সম্মেলনে দিবসটি আন্তর্জাতিকভাবে পালনের প্রস্তাব গৃহীত হয়। ১৯১১ সালে ইউরোপের কয়েকটি দেশে এটি উদ্যাপিত হয়। পরবর্তীতে ১৯৭৫ সালে United Nations আনুষ্ঠানিকভাবে ৮ মার্চকে আন্তর্জাতিক নারী দিবস হিসেবে স্বীকৃতি দেয়। সেই থেকে দিবসটি বিশ্বব্যাপী নারীর অধিকার, সমতা ও মর্যাদা প্রতিষ্ঠার এক গুরুত্বপূর্ণ প্ল্যাটফর্মে পরিণত হয়েছে।
বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে নারী আন্দোলনের ইতিহাস সংগ্রাম ও সাফল্যে সমৃদ্ধ। ভাষা আন্দোলন, মুক্তিযুদ্ধ, গণতান্ত্রিক আন্দোলন—প্রতিটি অধ্যায়ে নারীর সক্রিয় অংশগ্রহণ রয়েছে। তৈরি পোশাক শিল্পে নারীদের ব্যাপক সম্পৃক্ততা দেশের অর্থনীতিকে শক্তিশালী করেছে। ক্ষুদ্রঋণ কর্মসূচি নারীদের আর্থিক স্বাবলম্বিতা বাড়িয়েছে। প্রাথমিক শিক্ষা ও স্বাস্থ্যখাতে অগ্রগতির পেছনেও নারীর অবদান অনস্বীকার্য। আজ গ্রাম থেকে শহর—প্রশাসন, শিক্ষা, চিকিৎসা, উদ্যোক্তা উন্নয়ন, প্রযুক্তি—সবখানেই নারীরা সক্ষমতার স্বাক্ষর রাখছেন।
তবুও বৈষম্য পুরোপুরি দূর হয়নি। মজুরি ব্যবধান, সিদ্ধান্তগ্রহণে সীমিত অংশগ্রহণ, রাজনৈতিক প্রতিনিধিত্বের ঘাটতি, লিঙ্গভিত্তিক সহিংসতা, বাল্যবিবাহ ও অনলাইন হয়রানি এখনো বাস্তবতা। অনেক ক্ষেত্রে আইন থাকলেও তার কার্যকর প্রয়োগ দুর্বল। সামাজিক মানসিকতার পরিবর্তন না হলে আইনি অগ্রগতি টেকসই হয় না। ফলে জেন্ডার প্যারাডাইম শিফট কেবল নীতিগত পরিবর্তন নয়; এটি মানসিকতার রূপান্তর।
আন্তর্জাতিক নারী দিবস ২০২৬ উপলক্ষে বাংলাদেশের প্রতিপাদ্য—“আজকের পদক্ষেপ, আগামীর ন্যায়বিচার, সুরক্ষিত হোক নারী ও কন্যার অধিকার।” এই বার্তা আমাদের স্মরণ করিয়ে দেয় যে ন্যায়বিচার কোনো বিমূর্ত ধারণা নয়; এটি নিরাপত্তা, শিক্ষা, স্বাস্থ্য, কর্মসংস্থান ও মর্যাদার সঙ্গে অঙ্গাঙ্গিভাবে জড়িত। নারী ও কন্যাশিশুর প্রতি সহিংসতা, বৈষম্য ও অবহেলা বন্ধ না হলে উন্নয়ন কখনোই টেকসই হবে না।
২০২৬ সালের বৈশ্বিক প্রতিপাদ্য ‘Give To Gain’—অর্থাৎ আমরা যখন দিই, তখনই আমরা পাই—লিঙ্গসমতার আলোচনাকে নতুন মাত্রা দিয়েছে। এখানে ‘দেওয়া’ মানে কেবল অর্থ নয়; বরং সুযোগ, সম্মান, জ্ঞান, সময় ও নেতৃত্বের ক্ষেত্র উন্মুক্ত করা। একটি মেয়েকে শিক্ষার সুযোগ দিলে সে শুধু নিজের জীবন নয়, তার পরিবার ও সমাজের ভবিষ্যৎ বদলে দিতে পারে। একজন নারী উদ্যোক্তাকে সমর্থন দিলে কর্মসংস্থান সৃষ্টি হয়, অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি বাড়ে। কর্মক্ষেত্রে সমান মজুরি ও নিরাপদ পরিবেশ নিশ্চিত করলে উৎপাদনশীলতা ও সৃজনশীলতা বৃদ্ধি পায়। অর্থাৎ, নারীর ক্ষমতায়ন সামগ্রিক উন্নয়নকে ত্বরান্বিত করে।
বর্তমান বিশ্ব প্রযুক্তি ও ডিজিটাল অর্থনীতির যুগে প্রবেশ করেছে। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, ডেটা সায়েন্স, সবুজ জ্বালানি ও জলবায়ু অভিযোজন—এসব খাত ভবিষ্যৎ নির্ধারণ করছে। কিন্তু প্রযুক্তি খাতে নারীর অংশগ্রহণ তুলনামূলকভাবে কম। STEM [বিজ্ঞান (Science), প্রযুক্তি (Technology), প্রকৌশল/ইঞ্জিনিয়ারিং (Engineering) এবং গণিত (Mathematics)] শিক্ষায় মেয়েদের আগ্রহ বাড়ানো, ডিজিটাল দক্ষতা প্রশিক্ষণ, কোডিং ও উদ্যোক্তা উন্নয়ন কর্মসূচি সম্প্রসারণ জরুরি। বাংলাদেশে ডিজিটাল রূপান্তরের অগ্রযাত্রায় নারীর অন্তর্ভুক্তি নিশ্চিত না হলে উন্নয়ন অসম থেকে যাবে। ফ্রিল্যান্সিং, ই-কমার্স ও স্টার্টআপ খাতে নারীর নেতৃত্ব অর্থনীতিকে আরও অন্তর্ভুক্তিমূলক করতে পারে।
কর্মক্ষেত্রে নিরাপত্তা ও সম্মান নিশ্চিত করা লিঙ্গসমতার অপরিহার্য শর্ত। যৌন হয়রানি প্রতিরোধ নীতিমালার বাস্তবায়ন, সহজ অভিযোগ ব্যবস্থাপনা ও দ্রুত বিচার প্রয়োজন। একই সঙ্গে নারী উদ্যোক্তাদের জন্য সহজ শর্তে ঋণ, বাজার সংযোগ ও পরামর্শ সেবা নিশ্চিত করা দরকার। অর্থনৈতিক ক্ষমতায়ন নারীর আত্মবিশ্বাস বৃদ্ধি করে এবং পরিবারে সিদ্ধান্তগ্রহণে তাদের ভূমিকা শক্তিশালী করে।
সামাজিক ও সাংস্কৃতিক মানসিকতার পরিবর্তনও অত্যন্ত জরুরি। অনেক সময় নারীর সাফল্যকে ব্যতিক্রম হিসেবে দেখা হয়, যেন এটি বিশেষ অনুগ্রহের ফল। এই দৃষ্টিভঙ্গি বদলাতে হবে। নারীর অর্জনকে স্বাভাবিক অধিকার হিসেবে স্বীকৃতি দিতে হবে। পরিবারে ছেলে-মেয়ের সমান সুযোগ নিশ্চিত করা, ঘরের কাজে সমান অংশগ্রহণ এবং সন্তান লালন-পালনে যৌথ দায়িত্ব গ্রহণ—এসব ছোট পদক্ষেপ বড় পরিবর্তনের পথ তৈরি করে।
গ্রাম ও শহরের বাস্তবতায় নারীর চ্যালেঞ্জ ভিন্ন। গ্রামীণ নারীরা কৃষিকাজ ও অনানুষ্ঠানিক শ্রমে যুক্ত থাকলেও প্রাতিষ্ঠানিক স্বীকৃতি কম পান। শহুরে কর্মজীবী নারীরা কর্মক্ষেত্রে বৈষম্য ও অনলাইন হয়রানির শিকার হন। উপকূলীয় অঞ্চলের নারীরা জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে জীবিকা ও নিরাপত্তাহীনতায় ভোগেন। তাই নীতি ও কর্মসূচি প্রণয়নে প্রেক্ষাপটভিত্তিক দৃষ্টিভঙ্গি অপরিহার্য।
লিঙ্গসমতা কেবল নারীর দায়িত্ব নয়; এটি সমাজের সম্মিলিত অঙ্গীকার। পুরুষদের ইতিবাচক সম্পৃক্ততা ছাড়া এই পরিবর্তন সম্ভব নয়। শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, ধর্মীয় ও সামাজিক সংগঠন এবং গণমাধ্যম—সবাইকে সমতার সংস্কৃতি গড়ে তুলতে ভূমিকা রাখতে হবে। মিডিয়ায় নারীর ইতিবাচক উপস্থাপন ও নেতৃত্বের গল্প নতুন প্রজন্মকে অনুপ্রাণিত করতে পারে।
সবশেষে বলা যায়, জেন্ডার প্যারাডাইম শিফট একটি চলমান প্রক্রিয়া। এটি রাতারাতি ঘটে না; ধীরে ধীরে সামাজিক চেতনায় পরিবর্তন আনে। সমতা কোনো দয়া নয়—এটি অধিকার, এবং একই সঙ্গে উন্নয়নের ভিত্তি। নারীর অগ্রগতি মানেই সমাজের অগ্রগতি।
এই গুরুগম্ভীর আলোচনার মধ্যেও আমাদের কিছু সাধারণ প্রত্যাশা হৃদয়ে ধারণ করতে হবে—প্রতিটি পরিবারে অর্থনৈতিক মুক্তি নিশ্চিত হোক; কোনো শিশু ক্ষুধা নিয়ে ঘুমাতে না যাক; প্রতিটি শিশু পুষ্টি নিয়ে বেড়ে উঠুক; বাল্যবিবাহ ও শিশু শ্রম নির্মূল হোক; সকল শিশু বিদ্যালয়ে যাক এবং উচ্চশিক্ষার স্বপ্ন দেখুক। অদূর ভবিষ্যতে বাংলাদেশের শতভাগ নাগরিক হোক শিক্ষিত ও কর্মক্ষম, অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে প্রত্যক্ষভাবে সম্পৃক্ত। মানবিক উন্নয়ন সূচকে এগিয়ে যাক দেশ।
আজকের স্বপ্নই একদিন পরিণত হবে বাস্তব পরিসংখ্যান ও দৃশ্যমান উন্নয়নের চিত্রে। আন্তর্জাতিক নারী দিবস ২০২৬ হোক সেই অঙ্গীকারের দিন—আজকের দৃঢ় পদক্ষেপেই নিশ্চিত হোক আগামীর ন্যায়বিচার। নারী ও কন্যাশিশুর নিরাপত্তা, মর্যাদা ও সমঅধিকার প্রতিষ্ঠার মধ্য দিয়েই গড়ে উঠবে একটি ন্যায়ভিত্তিক, মানবিক ও সমৃদ্ধ বাংলাদেশ।
লেখক;
রাজু উইলিয়াম রোজারিও
উন্নয়ন সংগঠক ও প্রাবন্ধিক