শনিবার, ০৪ এপ্রিল ২০২৬, ০২:০৪ পূর্বাহ্ন
আমরা স্বার্থপর, তবুও মানুষ হিসেবে আমরা শ্রেষ্ঠ জাতি!
আদম-হাওয়ার পরেই মা-বাবার কারনেই আজ সারা বিশ্বে মানব জাতির বিস্তার ঘটেছে, ঘটবে আগামী দিনেও! ‘মা’ ও ‘বাবা’ খুব ছোট্ট দুটি শব্দ! অথচ এই দুটি শব্দের মধ্যে লুকিয়ে থাকে নিখাঁদ ও নি:স্বার্থ আদর-স্নেহ-ভালোবাসা! যা দুনিয়ার কোনো মাপযন্ত্র দ্বারা পরিমাপ করার সাধ্য কারোরই নেই। প্রত্যেকের মা-বাবা সন্তানদের জন্য প্রতিনিয়ত কত কষ্ট, ত্যাগ করেছেন, করেন বা করবেন, তা কি আমরা কখনো অনুধাবন করতে পারি? হয়তো পারি, যখন তাঁরা না ফেরার দেশে পাড়ি জমান। প্রত্যেক মা-বাবা তাঁদের সন্তানদের জন্য পৃথিবীর শ্রেষ্ঠ নিয়ামত! সৃষ্টিকর্তা মানবজাতিকে মা-বাবার মাধ্যমেই এত নির্মল-সুন্দর পৃথিবীর আলো বাতাস, পাহাড়-পর্বত, নদী-সমুদ্র, সবকিছুই দেখিয়েছেন।এ পৃথিবীতে একমাত্র মা-বাবাই সন্তানের আপনজন। সন্তানের জন্য মা-বাবার মতো আপন পৃথিবীতে দ্বিতীয় কেউ নেই। কেউই হতে পারেনা! সন্তান জন্ম নেয়ার পর মা-বাবা সর্বোচ্চ ত্যাগ স্বীকার করেন। সৃষ্টিকর্তা মা-বাবার খেদমত করার জন্য সর্বাধিক তাগিদ দিয়েছেন। মহান প্রভু তাঁর ইবাদতের পর মা-বাবার খেদমত করার নির্দেশ দিয়েছেন। মুসলিম জাতির উপর সৃষ্টিকর্তার ইবাদত করা ফরজ ঠিক মা-বাবার খেদমত করা প্রত্যেক মানুষের উপরও ফরজ। সারাক্ষণ আল্লাহর সকল হুকুম পালনে বাধ্য থাকতে হবে, তেমনি জীবনের প্রতিক্ষেত্রে মা-বাবার অনুগত থেকে তাঁদের খেদমত করতে হবে।
মহান আল্লাহ আমাদের নির্দেশ করেছেন- ”তোমরা একমাত্র আল্লাহ তা’আলার ইবাদত করো, এবং মা-বাবার প্রতি সর্বদা সদ্ব্যবহার করো। তাদের একজন বা উভয়েই তোমাদের জীবদ্দশায় বার্ধ্যকে উপনীত হলে তাদেরকে ‘উফ’ শব্দ বলোনা (বিরক্তি, উপেক্ষা, অবজ্ঞা, ক্রোধ ও ঘৃণাসূচক কোনো কথা) এবং তাদেরকে ধমক দিওনা, তাদের সাথে সম্মান সূচক নম্র কথা বলো। মমতা বশে তাদের প্রতি নম্রতার পক্ষপুট অবনমিত কর এবং বল “হে আমার রব ! তাদের প্রতি দয়া কর যেভাবে শৈশবে তাঁরা আমাকে প্রতিপালন করেছিলেন। তোমাদের অন্তরে যা আছে তা তোমাদের প্রতিপালক ভাল করেই জানেন। যদি তোমরা সৎ হও, তবে তিনি তওবাকারীদের জন্য ক্ষমাশীল”। অন্যত্রে ইরশাদ হচ্ছে, “তোমরা তোমাদের রবের ইবাদত করবে ও কোন কিছুকে তাঁর সঙ্গে শরীক করবে না এবং মা-বাবা, আত্মীয়-স্বজন, এতিম-অনাথ, অভাবগ্রস্থ, নিকটাত্মীয়, দূর, প্রতিবেশী, সঙ্গী-সাথী পথচারী এবং তোমাদের অধিকারভুক্ত দাস-দাসীদের প্রতি সদ্ব্যবহার করবে” । মানুষের সম্পদ সৃষ্টিকর্তার জন্য ব্যয় যেমনি করতে হবে ঠিক সন্তানরাও মা-বাবার খেদমতের জন্য ব্যয় করতে হবে। মা-বাবা সন্তানের অতি আপনজন। তাঁদের সর্বাবস্থায় সন্তুষ্ট রাখতে হবে, সম্মানপ্রদর্শন করতে হবে, সেবা করতে হবে। অন্যান্য ধর্মেও সমানভাবে মা-বাবার প্রতি সন্তানের দায়িত্ব-কর্তব্যের গুরুত্বের কথা খুবই গুরুত্বের সাথে বলা হয়েছে।
বর্তমান যুগের সভ্য-শিক্ষিত সমাজে অশিক্ষিত লোকেরা মা-বাবার সাথে তো দুর্ব্যবহার করছেই; একই সাথে আধুনিক শিক্ষায় শিক্ষিত লোকদের অবস্থা আরো করুণ ও ভয়াবহ। অশিক্ষিত লোকদের চেয়ে শিক্ষিতরা আধুনিকতার দম্ভে মা-বাবার সাথে দুর্ব্যবহার করছেন। শিক্ষিত ছেলেরা যদি শিক্ষিত স্ত্রী পেয়ে যান তাহলে মা-বাবার জন্য কাল হয়ে দাঁড়ায়। কারণ বয়োবৃদ্ধ মা-বাবার সেবায় এগিয়ে এলে তাদের বর্তমান আধুনিক স্টাইল নষ্ট হয়ে যায়। বিধায় মা-বাবার খেদমতের ধারে কাছে আসতে রাজি হন না; বরং দূরে দূরে থাকতে বাধ্য হন। অথবা, নিজেদের সন্তানদের ইংলিশ মিডিয়াম স্কুলের সভ্যতায় লালন-পালন সহ ব্যক্তিগতকারণেও মা-বাবার প্রতি দায়িত্বটা যেন গৌণ হয়ে গেছে এই ডিজিটাল সভ্যতায়!
শিক্ষিত-অশিক্ষিত ছেলে/ মেয়েরা তাদের প্রিয়তম স্বামী কিংবা প্রিয়তমা স্ত্রীর কুপরামর্শে মা-বাবার স্বগীয় সাহচর্য ছিন্ন করতে বাধ্য হন, যা অনেক হৃদয়বিদারক ও মর্মস্পর্শী। বর্তমান সমাজে এটার অন্যতম কারণ ইসলামি সুশিক্ষা ও নৈতিক মূল্যবোধের অবক্ষয়। শিক্ষিত লোক মা-বাবার সাথে দুর্ব্যবহার করবে কেন? স্বাী/স্ত্রীর সুপরামর্শ সায় না দিয়ে কুপরামর্শে সায় দেবে কেন? শিক্ষিত ছেলেমেয়েরা মা-বাবার অবাধ্য হলে জাতি নৈতিকতা শিখবে কোথায়? সন্তানের উজ্জ্বল ভবিষ্যতের জন্য নিশ্চিই মা-বাবার বাধ্য থাকতে হবে এবং তাঁদের সেবায় আত্মনিয়োগ করতে হবে।
ইসলামের ইতিহাসে মা-বাবার দায়িত্ব ও গুরুত্ব অপরিসীম। হাদিসে বর্ণিত, যখন কোনো সন্তান তার আপন মা-বাবার প্রতি রহমতের দৃষ্টিতে তাকায়, তখন সৃষ্টিকর্তা প্রতিটি দৃষ্টির বিনিময়ে তার আমলনামায় একটি ‘মকবুল হজ্ব’ এর সওয়াব লিখে দেন।
সাহাবায়ে কেরাম আরজ করলেন, ইয়া রাসূলাল্লাহ (সা:)! যদি কোনো ব্যক্তি দৈনিক একশত বার এরূপ তাকায় তবুও কি সে এই সওয়াব পাবে? তিনি জবাবে বললেন ‘হ্যাঁ’। আল্লাহ অতি মহান, অতি পবিত্র। হাদিসে বর্ণিত আছে, তার নাসিকা ধুলিসাৎ হোক, তার নাসিকা ধুলিসাৎ হোক, তার নাসিকা ধুলিসাৎ হোক- একথা রাসুল (সা:) তিন বার বললেন।
জিজ্ঞাসা করা হলো, ইয়া রাসূলাল্লাহ! কে সে? যার নাসিকা ধুলিসাৎ হোক। তিনি বললেন, যে ব্যক্তি তার মা-বাবার একজনকে অথবা উভয়জনকে তাদের বার্ধক্য অবস্থায় পেল অথচ (তাদের খেদমত করে ) সে বেহেশতে প্রবেশ করল না। যে ব্যক্তি তার মায়ের চক্ষুদ্বয়ের মধ্যভাগে চুমা দিবে সে দোযখ থেকে মুক্তি পাবে। অনত্রে বর্ণিত, যে ব্যক্তি তার মায়ের পা চুম্বন করল (কদমবুছি করল) সে যেন বেহেশতের চৌকাঠে চুম্বন করল।
যারা মা-বাবার সাথে খারাপ ব্যবহার, তাঁদের অবাধ্যতা, কষ্ট দেয়া এবং তাঁদের সাথে দুর্ব্যবহার করে তাদের উপর আল্লাহ ও তাঁর রাসুল (সা:) এবং ফেরেশতারা অভিসম্পাত করেন। এরূপ কাজে সৃষ্টিকর্তা ভীষণ রাগান্বিত হন। মা-বাবার অবাধ্য ছেলে ও মেয়ে যত বেশি ইবাদত করুক না কেন সে কখনো সৃষ্টিকর্তার নৈকট্য লাভ করবে না। সারাজীবন যতই মা-বাবার খেদমত করি না কেন, তবুও তাঁদের ঋণ শোধ করা যাবে না। মা-বাবার খেদমত ও তাদের দোয়া নেওয়া একান্ত জরুরি।
তিন ব্যক্তির দোয়া সাথে সাথে কবুল করা হয়, তাদের মধ্যে রয়েছে মা-বাবার দোয়া, মুসাফিরের দোয়া ও মজলুমের দোয়া। মা-বাবার নেক দোয়া প্রত্যেক সন্তানের সুন্দর জীবনের শ্রেষ্ঠ পাথেয়।
আল্লাহ তায়ালা আমাদের জীবিত মা-বাবার নেক হায়াত দান করুন। তাদের খেদমত করার তৌফিক দান করুন। এবং যারা কবরে চলে গেছেন তাদের কবরগুলোকে জান্নাতের বাগান বানিয়ে দিন। (আমিন)
বর্তমানে অসুস্থ প্রতিযোগিতার এই নষ্ট সময়ে নামে মাত্র শিক্ষিত মানুষদের মস্তিষ্ক বিকৃত হতে চলেছে! ক্রমশ: মানব জাতির জীবনটা যেন অনেক বেশি কমপ্লিকেটেড হয়ে গেছে। ধন-দৌলত, মিথ্যা-মোহ আর মরীচিকার পেছনে ছুটতে গিয়ে মা-বাবার মতো নিখাঁদ মানিক রতনকে অবহেলা করেই যাচ্ছি প্রতিনিয়ত! আমাদের অনেক বড় বড় ডিগ্রী আছে বটে! অথচ, মা-বাবার সাথে সৌহার্দ্যপূর্ণ আচরন করার মতো শিক্ষা রপ্ত করতে পারিনি কোনো বিদ্যাপীঠ থেকে! তবুও মানুষ হিসেবে কি আমরা শ্রেষ্ঠ জীব? নাকি শ্রেষ্ঠ না হয়ে বরং বড্ড অসহায় জাতিতে পরিনত হয়েছি? ধিক্, ধিক্, শত ধিক্! বড়ই লজ্জা পাওয়া উচিৎ আমাদের! অসহায় পিতামাতার জীবন সায়াহ্নে অথবা ক্রান্তিবেলায় আমরা সন্তানেরা যেন পালিয়ে বাঁচতে চাই! কেউ কেউ ভাবি, ওসব তো বড়দের কাজ! ছোটদের ওসব নিয়ে ভাবার দরকার কি? অথবা, অনেকে ভাবে, ছোটদেরই তো বেশি দায়িত্ব কিংবা সে তো চাকুরী করেনা তাহলে সেই তো দায়িত্ব পালন করতে বাধ্য! যদি এমনটি ঘটে, বড় বোন তো মায়ের মতোই এবং সে-তো প্রতিনিয়ত দায়িত্ব পালন করেই গেছে সারাটি জীবন! অতএব সেই করবে অথবা করতে বাধ্য! এরকম নানা ধরনের মিশ্র প্রতিক্রিয়া, অন্যায় আবদার, প্রচলিত ধ্যান ধারণার ফলে মা-বাবারা প্রতিনিয়ত কেবল আদর-স্নেহ বঞ্চিতই হচ্ছেনা, বরং ”মানুষ” নামের কলঙ্কিত জাতিতে পরিণত হচ্ছি! আমরা স্ত্রী-সন্তান কিংবা স্বামী-সন্তান নিয়ে এতটাই ব্যস্ত থাকি যে, মা-বাবার বিষয়টি মাথাতেই আনিনা! প্রয়াজনও মনে করিনা। কেউ কেউ আবার মনে মনে ভাবি, আর মাত্র ক’টা দিন পরেই সন্তানদের পরীক্ষা শেষ হলে কিংবা সাংসারিক দায়িত্ব সম্পন্ন করার পরেই মা-বাবার প্রতি অনেক বেশি দায়িত্বশীল হয়ে উঠবো! এত শিক্ষিত হবার পরেও সত্যিই আমরা এতটাই মূর্খ যে, আমাদের চিন্তাশক্তি বেজায় অপরিপক্ক, বেজায় অপরিনামদর্শী! আদৌ কী আমরা সেই সময় পাবো? সত্যিকার অর্থে আমাদের এমন কি কোনো নিশ্চয়তা রয়েছে? ছোট বেলায় সিনেমার গানটি তাই খুব মনে পড়ে গেলো, “জীবনের গল্প, বাকি আছে অল্প, যা কিছু দেখার নাও দেখে নাও যা কিছু বলার যাও বলে যাও পাবে না সময় আর হয়তো।” সত্যিই আমরা জগৎ সংসার নিয়ে এতটাই ব্যস্ত থাকি যে, মা-বাবার জন্য কোনো সময়ই বরাদ্দ থাকেনা! এত কিছুর পরেও আমরা নিজেদেরকে দাবি করি, “তবুও আমরা শ্রেষ্ঠ জাতি!”
লেখক:
মো: তানজিমুল ইসলাম
লেখক, প্রাবন্ধিক ও কলামিস্ট
০১৭৬৭-৫৯১৩৫৬
Email: aronnyok@gmail.com