শনিবার, ০৪ এপ্রিল ২০২৬, ০২:০৩ পূর্বাহ্ন
দেশের সবচেয়ে বড় প্রাকৃতিক মধুর ভাণ্ডার সুন্দরবনে বুধবার থেকে শুরু হয়েছে চলতি মৌসুমের মধু আহরণ। প্রতি বছরের মতো এবারও এপ্রিল ও মে মাসজুড়ে বন থেকে মধু সংগ্রহের অনুমতি পেয়েছেন মৌয়ালরা। তবে মৌসুমের শুরুতেই বনদস্যুদের চাঁদাবাজির অভিযোগে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়েছে বননির্ভর মানুষের মধ্যে।
স্থানীয়দের অভিযোগ, বনদস্যুদের কবল থেকে বাঁচতে এবং নিরাপদে মধু তুলতে অনেক মৌয়ালকে আগে থেকেই টাকা গুনতে হচ্ছে। দুই মাসের জন্য একজন মৌয়ালের কাছ থেকে নেওয়া হচ্ছে ২১ হাজার টাকা। এই অর্থ পরিশোধের পরই নির্দিষ্ট এলাকায় তাদের নির্বিঘ্নে চলাচলের ‘অনুমতি’ দেওয়া হচ্ছে।
মৌয়ালদের ভাষ্য, এই টাকা সরাসরি বনদস্যুদের হাতে দেওয়া হয় না। এলাকার কয়েকজন মধ্যস্থতাকারী আগেই অর্থ সংগ্রহ করে বিভিন্ন দস্যু বাহিনীর কাছে পৌঁছে দেন। স্থানীয়দের দাবি, এই টাকার ভাগ যায় কয়েকটি সক্রিয় দস্যু চক্রের কাছে। এর মধ্যে ‘দয়াল’ বাহিনী পায় ৭ হাজার টাকা, ‘নানাভাই’ বাহিনী ৫ হাজার, ‘জোনাব’ বাহিনী ৬ হাজার এবং ‘দুলাভাই’ বাহিনী ৩ হাজার টাকা।
সুন্দরবনের ভেতরে কার্যকর নিরাপত্তার অভাবেই এমন পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে বলে অভিযোগ মৌয়ালদের। বন বিভাগের কাছ থেকে অনুমতিপত্র নেওয়ার পরও বনের ভেতরে প্রবেশের পর তাদের নিজেদের নিরাপত্তা নিজেরাই নিশ্চিত করতে হচ্ছে।
সুন্দরবন-এর সাতক্ষীরা রেঞ্জের বুড়িগোয়ালিনী এলাকায় মধু আহরণ উদ্বোধনের দিন নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক মৌয়াল বলেন, “বনে ঢোকার পর কখন কার হাতে পড়তে হবে, তার কোনো নিশ্চয়তা নেই। অপহরণ, মারধর, টাকা দাবি—সবকিছুর ভয় থাকে। তাই অনেকে আগে থেকেই টাকা দিয়ে রাখেন, যেন অন্তত কাজটা শান্তিতে করতে পারেন।”
পায়রা এলাকার মৌয়াল শফিকুল ইসলাম বলেন, আমরা সারা বছর এই সময়টার জন্য অপেক্ষা করি। কিন্তু এখন মধু সংগ্রহ মানেই ভয় নিয়ে বনে যাওয়া। অনুমতি থাকলেও বাস্তবে কোনো নিরাপত্তা নেই। টাকা না দিলে অপহরণ ও নির্যাতনের ঝুঁকি থাকে।
একই এলাকার আরেকজন মৌয়াল জানান, বনদস্যুদের চাঁদাবাজির বিষয়টি সবাই জানলেও খুব কম মানুষ প্রকাশ্যে মুখ খোলেন। কারণ, পরে প্রতিশোধের আশঙ্কা থাকে।
এদিকে মৌয়ালদের মহাজন শরীফ হোসেন বলেন, “অন্য বছর ৭-১০টি নৌকা প্রস্তুত করতাম। কিন্তু এবার দস্যুদের চাঁদার কারণে এখন পর্যন্ত একটি নৌকাও পাঠাতে পারিনি।
মধু আহরণ মৌসুমের উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তব্যে শেখ ফরিদুল ইসলাম বলেন, সুন্দরবনের দস্যুরা আশপাশেই রয়েছে এবং তাদের বিরুদ্ধে সবাইকে সাহসের সঙ্গে দাঁড়াতে হবে। তিনি বলেন, প্রশাসনকে সঠিক তথ্য দিলে এবং স্থানীয়ভাবে দস্যুদের শনাক্ত করা গেলে সুন্দরবনকে দস্যুমুক্ত করা সম্ভব।
মৌসুমের শুরুতেই এমন চাঁদাবাজির অভিযোগে সুন্দরবনে মধু আহরণ নিয়ে নতুন করে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। অনেক মৌয়াল আশঙ্কা করছেন, দ্রুত ব্যবস্থা না নিলে জীবিকার এই প্রধান মৌসুমেও তারা নিরাপদে বনে যেতে পারবেন না।