শনিবার, ০৪ এপ্রিল ২০২৬, ০৩:৩৯ পূর্বাহ্ন
লেখক:
মো: তানজিমুল ইসলাম, বিউটি কুইন ও ফেরদৌসী আলম
কো-অর্ডিনেটর, এডভোকেসি এন্ড চাইল্ড প্রটেকশন
ওয়ার্ল্ড ভিশন বাংলাদেশ।
আমরা ছোট বড় সকলেই কম বেশি সকলেই জানি, পরিষ্কার পরিচ্ছন্নতা ঈমানের অঙ্গ। হ্যাঁ বাস্তব জীবনেও এর কোনো বিকল্প নেই। পরিষ্কার পরিচ্ছন্নতা যেমন ঈমানের অঙ্গ ঠিক তদ্রুপ, সুস্বাস্থ্যের জন্য এটি অত্যাবশ্যকীয় ও অবিচ্ছেদ্য অংশ্। প্রতি বছরের ন্যায় এবারোবিশ্বের সাথে তাল মিলিয়ে পুরো দেশব্যাপী একযোগে পালিত হচ্ছে ‘বিশ্ব হাত ধোয়া দিবস’।বাংলাদেশ সহ পুরো বিশ্ব ব্যাপী জনসচেতনতা তৈরী ও উদ্বুদ্ধ করনের জন্য এটি একটি গণসচেতনতামূলক দিবস। প্রতি বছর ১৫ অক্টোবরে বিশ্ব ব্যাপী এটি পালিত হয়ে থাকে। জনসাধারণের মধ্যে সাবান দিয়ে সঠিক নিয়মে হাত ধোয়ার মাধ্যমে রোগের বিস্তার রোধ করার বিষয়ে সচেতনতা তৈরী করার উদ্দেশ্যে এই দিবসটি পালিত হয়ে থাকে।
শুধুমাত্র পরিচ্ছন্নতার অভাবে কেবল স্বাস্থ্য ঝুঁকিই বাড়ে না বরং অপরিষ্কার পরিবেশে ব্যাকটেরিয়া, ভাইরাস, পরজীবী এবং ছত্রাকের মতো জীবাণু সহজেই বংশবৃদ্ধি করে, যা বিভিন্ন রোগ সৃষ্টির জন্য নিয়ামক হিসেবে কাজ করে এবং সহজেই ছড়িয়ে পড়ে,যা বিভিন্ন রোগের কারণ হতে পারে। অপরিষ্কার এবং অস্বাস্থ্যকর পরিবেশ রোগ সৃষ্টিকারী জীবাণুর আঁতুড়ঘরে পরিণত হতে পারে, যেমন – দুর্বল স্যানিটেশন ব্যবস্থার কারণে কলেরা, আমাশয় এবং টাইফয়েডের মতো রোগ হতে পারে। নিয়মিত পরিচ্ছন্নতার অভাব শরীরের ভেতর দীর্ঘমেয়াদী স্বাস্থ্য সমস্যা তৈরি করতে পারে, যেমন – শরীরের ভেতর পরজীবী সংক্রমণ। পরিচ্ছন্নতার অভাব মানসিক স্বাস্থ্যের উপরও নেতিবাচক প্রভাব ফেলে, যেমন – উদ্বেগ এবং মনোযোগের অভাব দেখা দিতে পারে। সুতরাং, পরিচ্ছন্নতা বজায় রাখা একটি স্বাস্থ্যকর জীবন যাপনের জন্য অত্যন্ত জরুরি। অতএব হাত ধোয়ার নানাবিধ গুরুত্ব রয়েছে। যা ইতোপূর্বে শিখেছি যে, নিয়মিত হাত ধোয়ার অভ্যাস ইনফ্লুয়েঞ্জা, COVID-19 এবং অন্যান্য সংক্রামক রোগের বিস্তার কমাতে সাহায্য করে।
বিশ্ব হাত ধোয়া দিবসের এবারের প্রতিপাদ্য বিষয়: “হাত ধোয়ার নায়ক হোন” (Be a hand washing hero) যা আমাদেরকে বোঝাতে সক্ষম করে যে, নিয়মিত হাত ধোয়ার মাধ্যমে জীবনকে অনেকাংশে ঝুঁকিমুক্ত রাখা সম্ভব। এটি রোগ প্রতিরোধ এবং সংক্রমণ থেকে বাঁচতে সাহায্য করে, কারণ হাত পরিষ্কার থাকলে চোখ, নাক ও মুখে জীবাণু প্রবেশ করতে পারে না। হাত ধোয়ার সঠিক নিয়ম হলো: পরিষ্কার পানি দিয়ে হাত ভেজাতে হবে, পর্যাপ্ত পরিমাণে সাবান লাগিয়ে হাত ভালো করে ঘষতে হবে। এরপর হাতের তালু, হাতের উল্টো পিঠ, আঙুলের ফাঁক এবং নখের নিচে অন্তত ২০-৩০ সেকেন্ড ধরে ঘষতে হবে। এরপরে পরিষ্কার পানি দিয়ে হাত থেকে সাবান ধুয়ে ফেলতে হবে। সবশেষে,পরিষ্কার তোয়ালে বা টিস্যু দিয়ে হাত মুছে নিতে হবে।
দিনের মধ্যে পাঁচটি গুরুত্বপূর্ণ সময় রয়েছে যেখানে মল-মুখের রোগের সংক্রমণ কমাতে সাবান দিয়ে হাত ধোয়া গুরুত্বপূর্ণ: টয়লেট ব্যবহারের পরে (প্রস্রাব , মলত্যাগ , মাসিক স্বাস্থ্যবিধির জন্য), শিশুর তলদেশ পরিষ্কার করার পরে (ডায়পার পরিবর্তন করা), শিশুকে খাওয়ানোর আগে, নিজে খাওয়ার আগে এবং মাছ-মাংস কাটা ও ধোয়ার আগে/পরে। অন্তত ২০ থেকে ৩০ সেকেন্ড সময় নিয়ে হাত ধোয়া উচিত। হাত ধোয়ার প্রধান উপকারিতা হলো এটি জীবাণু দূর করে এবং রোগ প্রতিরোধ করে। নিয়মিত হাত ধোয়ার মাধ্যমে আমরা চোখ, নাক এবং মুখের মাধ্যমে শরীরে জীবাণু প্রবেশ করা থেকে নিজেদের রক্ষা করতে পারি, যা বিভিন্ন সংক্রমণ, যেমন পরিপাকতন্ত্র এবং শ্বাসতন্ত্রের রোগ প্রতিরোধে সাহায্য করে। কোনো সন্দেহ নেই যে,জীবাণু থেকে সুরক্ষিত থাকার এটি একটি সহজ এবং অত্যন্ত কার্যকর উপায়। গবেষণায় দেখা গেছে দেশের মাত্র ৫১.৮% মানুষ নিয়মিত হাত ধুয়ে থাকে এবং ৫৭.৫% হ্যান্ড স্যানিটাইজার ব্যবহার করে। অতএব, এতে সুস্পষ্ট যে, এব্যাপোরে আমাদেরকে আরো অনেক বেশি সচেতনতা বাড়াতে হবে ও গন সংবেদনশীলতা বাড়াতে হবে ঠিক এক্ষুণি।
আমরা সকলেই জানি সম্প্রতি করোনাভাইরাসের বিস্তৃতি রোধে প্রধান সহায়ক হিসেবে বিবেচিত হয়েছে পরিষ্কার পরিচ্ছন্নতা। শুধু করোনাভাইরাসের বিস্তৃতি রোধই নয়; জ্বর, ডায়রিয়ার মতো রোগের প্রাদুর্ভাব রোধেও স্বাস্থ্যবিধি মেনে হাত ধোয়া কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারে। অবচেতনভাবে আমরা হাত দিয়ে ক্রমাগত চোখ, নাক ও মুখ স্পর্শ করে থাকি। হাত অপরিষ্কার থাকলে এমন স্পর্শের মাধ্যমে দেহের ভেতর জীবাণু প্রবেশ করতে পারে। তাই কিছু সময় পরপর সাবান-পানিতে হাত ধুয়ে নিলে করোনাভাইরাসে সংক্রমণের আশঙ্কাসহ নানা ধরনের রোগব্যাধি অনেকটাই কমিয়ে আনা সম্ভব। করোনাভাইরাস আমাদের স্বাস্থ্যবিধি মেনে হাত ধোয়ার প্রয়োজনীয়তা দেখিয়ে গেছে। দৈনন্দিন জীবনে এ চর্চা অন্তর্ভুক্তির কোনো বিকল্প নেই।
সাধারনত: বাংলাদেশের মানুষের স্বাস্থ্যবিধির নানা বিষয়ে প্রাথমিক জ্ঞান মোটামুটি খারাপ নয়। তথাপি হাত ধোয়ার প্রয়োজনীয়তার ক্ষেত্রে বাস্তবতা ভিন্ন। অনেক ক্ষেত্রে অনেক শিক্ষিত মানুষেরাও অনেক বেশি উদাসীন। গত ২০২৩ সালে ইউনিসেফ পরিচালিত এক জরিপে দেখা গেছে, পানি ও সাবান দিয়ে বাংলাদেশের ৫৯ দশমিক ১ ভাগ মানুষ নিয়মিত হাত ধুয়ে থাকে। আরেক পরিসংখ্যানে দেখা যায়, সারা পৃথিবীর প্রতি পাঁচজনের মধ্যে দুজনেরই হাত ধোয়ার জন্য প্রয়োজনীয় সরঞ্জাম, যেমন পানি ও সাবানের ব্যবস্থা নেই।
২০১৮ সালে বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর ন্যাশনাল হাইজিন সার্ভের তথ্য অনুযায়ী ৪০ ভাগ মানুষের খাওয়ার আগে সাবান ও পানি দিয়ে হাত ধোয়ার অভ্যাস আছে, অন্যদিকে শিশুকে খাওয়ানোর আগে হাত ধুয়ে নেন ১৫ ভাগ নারী। ২৩ ভাগ পরিবারেই শৌচাগারের ৩০ ফুটের মধ্যে হাত ধোয়ার কোনো ব্যবস্থা বা তার জন্য প্রয়োজনীয় পানির কোনো উৎস নেই। ব্র্যাক, লাইফবয় ও প্রথম আলোর যৌথ উদ্যোগে গত ৩১ জুলাই থেকে ১১ আগস্ট পর্যন্ত পরিচালিত হয় ‘করোনায় স্বাস্থ্য সুরক্ষা’ শীর্ষক অনলাইন জরিপ। জরিপে অংশ নেওয়া ৩৫ দশমিক ৫০ শতাংশ দিনে ৩ থেকে ৫ বার সাবান ও পানি দিয়ে হাত ধুয়েছে। ৪৪ দশমিক ৯০ শতাংশই বলেছে, প্রয়োজনের সময় সাবান-পানি পাওয়া না যাওয়ায় হাত ধোয়ার ক্ষেত্রে বেশি সমস্যা হয়। আর ৩৮ দশমিক ৪০ শতাংশ বলেছে, নিয়মিত হাত ধোয়ার বিষয়টি তাদের মনে থাকে না।এ বছরের বিশ্ব হাত দোয়া দিবসের প্রতিপাদ্য অনুযায়ী আমাদের সচেতনতার ব্যাপারে অনেক বেশি গুরুত্ব দেয়া হয়েছে। প্রতি বছরের ন্যায় আবারো বিশ্ব হাত ধোয়া দিবস ফিরে ফিরে আসবে। কিন্তু গণ সচেতনতা বা বাড়ালে ও চর্চা না বাড়ালে এই দিবসের কোনো সার্থকতাই থাকবে। তাই আসুন, এ বারের প্রতিপাদ্যের সাথে একমত হয়ে বলি: নায়ক হতে চাইলে আগে সঠিক নিয়মে হাত ধৌত করি।