শনিবার, ০৪ এপ্রিল ২০২৬, ০৪:৫৩ পূর্বাহ্ন
লেখক:
মো: তানজিমুল ইসলাম
কলামিস্ট ও উন্নয়নকর্মী
এই পৃথিবীতে একমাত্র প্রাণী হিসেবে ‘মানুষ’ জাতি জন্মের পর পরই সংসারের আশ্রয়েই বেড়ে উঠতে থাকে। সুতরাং নি:ন্দেহে পরিবার আমাদের সকলের জীবনের সবচেয়ে বড় আশ্রয়স্থল! প্রত্যেকের জীবনেই নিজেদের পরিবার যেন এক অমূল্য উপহার, যেখানে সুখে-দু:খে, সবাই মিলেমিশে একে অপরের পাশে দাঁড়ায়, পরষ্পর দুঃখ-কষ্ট ভাগ করে নেয়! কিন্তু সময়ের প্রয়োজনে কিংবা অত্যন্ত ঠুনকো বিষয়েও কখনো কখনো পারিবারিক সম্পর্কগুলো বেজায় জটিল হয়ে যায়! অতি সামান্য মতানৈক্যের কারণে ঝগড়ার সৃষ্টি হয়! পক্ষান্তরে ভালোবাসা ও পারস্পরিক শ্রদ্ধা থাকলে সেই দূরত্বসমূহ খুব সহজেই দূর করা সম্ভব। আমরা অনেকেই একটি সুখী ও সমৃদ্ধিশীল পরিবারের স্বপ্নে বিভোর থাকি। যেখানে অন্তত: পরিবারের সদস্যরা পারস্পরিক স্নেহ, ভালোবাসা, শ্রদ্ধা ও অর্থনৈতিক সহযোগিতার মাধ্যমে একসাথে বাঁচবে, একসাথে মরবে, পরষ্পরের প্রতি দায়িত্ব পালন করবে! এটি একপাক্ষিক হলে কখনোই তার স্থায়িত্ব থাকেনা। পারবিারিক মূল্যবোধগুলোকেও তাই আইনি খাঁচায় বেঁধে রাখা সম্ভব নয়, বরং প্রত্যেকের মাঝে সম্প্রীতি, মানসিক ঐক্য, নিরাপত্তা এবং সামাজিকীকরণের একটি ইতিবাচক মানসিকতার খুব বেশি প্রয়োজন। সীমিত সম্পদ আর সীমাহীন দূর্ভোগকে সাথে নিয়েও মানুষ পারষ্পরিক বিশ্বাস আর শ্রদ্ধাবোধের মিশেলে সুখী না হোক অন্তত: শান্তিপূর্ণ জীবন-যাপন করতে সক্ষম হয়।
মানসিক ও সামাজিক নিরাপত্তার নিরিখে পরিবারের নিকট জনেরা পরষ্পরকে মানসিক ও সামাজিক সুরক্ষা এবং স্থিতিশীলতা প্রদান করবে, এটি যেন প্রত্যাশিত! অনুরুপভাবে নিদারুন প্রয়োজনে প্রিয়জনেরা অর্থনৈতিক সহযোগিতার ক্ষেত্রেও প্রিয়জনদের পাশে দাঁড়াবে এটি কোনো অস্বাভাবিক বিষয় নয়!সামাজিকীকরণের নিরিখে সামাজিক ও পারিবারিক মূল্যবোধ এবং সংস্কৃতির প্রাথমিক প্রতিষ্ঠান হিসেবে কাজ করে, যা সদস্যদের বিশেষ করে আগামী প্রজন্মকে সুনাগরিক হিসেবে বেড়ে উঠতে সাহায্য করে। পরিবার মানেই কেবল সন্তান জন্মদান নয়, বরং সন্তানদের সুন্দরভাবে প্রতিপালন এবং তাদেরকে সুনাগরিক হিসেবে গড়ে তোলার ক্ষেত্রে বড়দের অগ্রণী ভুমিকা রয়েছে। “এক বিশ্ব, এক পরিবার: প্রজন্মের পর প্রজন্ম সেতু নির্মাণ”। এটি একটি সার্বজনীন প্রতিপাদ্য, যা কিনা প্রতিটি জাতি, ধর্ম ও সম্প্রদায়ের প্রজন্মের মধ্যে ব্যবধান দূর করতে সাহায্য করে।
কিন্তু আধুনিক যুগের পরিবারের সদস্যদের মধ্যে কেমন যেন বাণিজ্যিকীকরণের সম্পর্ক পরিলক্ষিত হয়! পরিবারের প্রতিটি সদস্যের সমান গুরুত্ব থাকেনা। স্বয়ং মা-বাবাদের মধ্যেও এমন বৈপরীত্য দেখা যায়! কোনো কারণ ছাড়াই সুনির্দিষ্ট সন্তানের প্রতি মা-বাবার বাড়তি আগ্রহ-স্নেহ চোখে পড়ে! অন্য সন্তানদের বেলায় কড়াকড়ি শাসন জারি হলেও নির্দিষ্ট সন্তানের বেলায় তেমন কোনো সংবিধিবদ্ধ সতর্কীকরণ আইন প্রযোজ্য থাকেনা। পক্ষান্তরে, সন্তানদের মধ্যে যার আয় রোজগার বেশি সাময়িকভাবে তার মূল্যায়ন কখনো কখনো বেশি হলেও বেলাশেষে তার দায়িত্বশীলতার কিংবা অবদানের তেমন কোনো স্বীকৃতি মেলেনা। “আয়-রোজগার বেশি মানেই তাকে বেশি অবদান রাখতে হবে”-এ যেন অলিখিত আইন! মা-বাবার সেবার খাতে অবদান রাখতে পারার সৌভাগ্য হয়তো সবার হয়না। তবে এই অবদানের সীমারেখা অনেক সময় ভাই-বোন, মামা-খালা, চাচা-ফুপু পর্যন্ত গড়ায়! যার যখন প্রয়োজন পড়ে, সেখানে ঐ উপার্জনক্ষম সদস্যটির ডাক পড়ে অবলীলায়! অনেক ক্ষেত্রে অভ্যাস বশত: জনৈক ব্যক্তিটি স্বেচ্ছায় হাজির হয়ে পড়ে প্রয়োজনের নিরিখে! মা-বাবা, ছোট ভাই-বোনদেরকে লালন-পালন করতে পরার মধ্যেও এক ধরনের পবিত্র আনন্দের অনুভুতি রয়েছে, যা কেবলমাত্র কলুর বলদের মতো ঘানি টানা সন্তানেরাই উপলবদ্ধি করতে পারে। এ যেন অপার্থিব সুখের নামান্তর! তারা মনে মনে কবি কামিনী রায়ের কবিতার চরন স্মরণ করে: ‘পরের কারণে স্বার্থ দিয়া বলি এ জীবন মন সকলি দাও তার মত সুখ কোথাও কি আছে আপনার কথা ভুলিয়া যাও”! মানুষ হয়ে জন্মানোর এমনকি বড় ভাই/বোন হয়ে জন্মানোর সার্থকতাও বুঝি এটাই! পক্ষান্তরে, জীবন সায়ান্নে এমন কী কোনো প্রত্যাশাও মনে দাঁনা বাঁধেনা যে, ‘কোনো একদিন, সহোদরেরা স্বীকৃতি নয় বরং বিনয়ী হয়ে তাদের সাথে সদাচরন করবে! অন্তত: নিদেন পক্ষে বেয়াদবী আচরন করবে না! যদি এমনটি কখনো ঘটে, তখন কি কষ্ট পাওয়াটা খুব দোষের কিছু হবে? বাস্তবতার নিরিখে সকল অন্যায়-আচরন বড়দেরকে সবকিছু মেনে নিতে হবে, চোখ বুজে আধুনিক প্রজন্মের কনিষ্ঠ সহোদরদের সকল অন্যায় আচরন মেনে নিতে হবে! বোনাস হিসেবে অনাকাঙ্খিত অপমানসমূহ হাসিমুখে সহ্য করে যেতে হবে! নয়তো মা-বাবা কষ্ট পেতে পারে! সকল কিছুর প্রত্যক্ষদর্শী মা-বাবাগণ বিশেষ ক্ষেত্রে অনেক আদুরে কন্ঠে এভাবেই সায় দিয়ে চলেন, ‘কি আর করার, সে ছোট মানুষ, এখনো জ্ঞান হয়নি, সে কী অতটা বোঝে?” ইত্যাদি সান্ত্বনার বাণী দিয়ে কলুর বলদ খ্যাত ‘প্রিয়জন নামক প্রয়োজনীয় ব্যক্তিটিকে’ অহেতুক দু:খ লাঘব করার চেষ্টা করার বৃথা চেষ্টায় মগ্ন থাকে! সংসারে ছোট্ট সহদোরেরা পঞ্চাশ বছর পেরিয়ে যেমন ছোট্টটি থাকে, মা-বাবার প্রশ্রয় পেয়ে ঠিক জ্ঞান-বুদ্ধিও থাকে সেই ছোট্টটির মতোই! তবে কী সে আদৌ বড় হবে না? বিদ্যা-বুদ্ধি সত্ত্বেও বেয়াদবী আচরনেই কি কেবল পটু হতে শিখবে? এটাই হয়তো বাঙালী পরিবারের অলিখিত নিয়ম। এই চর্চাই যে হয়ে আসছে বছরের পরে বছর, যুগের পরে যুগ! তবুও হয়তো বড়রা শান্তির ঢেঁকুর গেলে! এমনি করে দায়িত্বশীলতার তকমা লাগে গায়ে! মনের মধ্যে আধ্যাত্নিক সুখ উপভোগ করতে থাকে এসব প্রিয়জন নামক “প্রয়োজনীয় ব্যক্তিগণ”! নিজ পরিবারের গন্ডি পেরিয়ে বর্ধিত পরিবার যেমন মামা-মামী, চাচা-চাচী, খালা-খালু কিংবা ফুপা-ফুপুর পরিবারেও যখন প্রয়োজনের তাগিদে এদের পদচারনা ঘটে, তখন যেন দিগ্বিদিক তাদের নাম, যশ, খ্যাতি ছড়িয়ে পড়ে মুহুর্তেই! অনেক মহৎ ব্যক্তির আসনে তাঁকে অধিষ্ঠিত করা হয়! এ যেন বাড়তি সুখ, বাড়তি সম্মান, বাড়তি গুরুত্ব! কিন্তু প্রয়োজন মিটে গেলে কেমন হয়, তা কী অগ্রিম অনুমান করা সম্ভব? হ্যাঁ, ভূক্তভোগী ব্যক্তিগণ তথা প্রিয়জন নামক “প্রয়োজনীয় ব্যক্তিগণই” বোঝেন এর আসল স্বাদ! এর তিক্ত অভিজ্ঞতা, কিংবা নিজ হাতে শিক্ষিত প্রজন্ম তৈরির নামের মানুষরুপী জানোয়ার বানানোর বিপরীত প্রতিক্রিয়া ও এর ভয়াবহতার ব্যপকতা আসলে কেমন!
তাই বলে কি আগামী প্রজন্ম দায়িত্ব পালন করা ছেড়ে দেবে? না, মোটেও তা নয়, বরং মা-বাবার পাশে থেকে সংসারের ঘানি টানতে পারার যে প্রকৃত আনন্দ তা কি করে বুঝবে যাদের সেই সুযোগ কখনো আসেনি কিংবা আসবেওনা! সুতরাং “প্রিয়জন নয় বরং প্রয়োজন হয়ে বাঁচি” এই সংসারে, সমাজে, এই জগতে! যাতে করে আজীবন বেঁচে থাকি এই পৃথিবীর পরেও অন্য পৃথিবীতে! শুধুমাত্র ভালোবাসা কিংবা সম্পর্কের খাতিরে কারো কাছে প্রিয় হতে না চেয়ে, বরং নিজের প্রয়োজন বা গুরুত্বের জায়গা তৈরি করা প্রত্যেকের ঐকান্তিক কর্তব্য, নিদেন পক্ষে পরিবারের কনিষ্ঠ সহোদরেরও।
আধুনিক কালে যৌথ পরিবারগুলো প্রায়শই ভেঙে যাচ্ছে! এর পেছনে সঙ্গতিপূর্ন কিছু কারণ রয়েছে, যেমন – অর্থনৈতিক চাপ, বৈবাহিক কলহ, মাদকাসক্তি, মানসিক স্বাস্থ্য সমস্যা, এবং একে অপরের প্রতি নির্যাতন বা অবহেলা। এছাড়া, শিল্পায়ন ও নগরায়ণের ফলে গ্রামীণ যৌথ পরিবার ভেঙে যাওয়া এবং নারীদের কর্মক্ষেত্রে অংশগ্রহণ বৃদ্ধিও একটি বড় কারণ। এছাড়াও আর্থিক চাপ, বৈবাহিক কলহ, পরিবারে সদস্যদের মধ্যে সঠিক বোঝাপড়ার অভাব এবং একে অপরের প্রতি অবহেলা, শিল্পায়ন ও নগরায়ণ মানুষের জীবনযাত্রায় পরিবর্তন এনেছে। মানুষ কাজের সন্ধানে শহরমুখী হচ্ছে, যা গ্রামীণ যৌথ পরিবার ভেঙে যাওয়ার অন্যতম প্রধান কারণ। সময়ের সাথে সাথে মানুষ ব্যক্তিগত স্বাধীনতা ও পছন্দের উপর বেশি গুরুত্ব দিচ্ছে। সঙ্গীর পছন্দ, জীবনযাপন, এবং ধর্ম বা রাজনৈতিক দৃষ্টিভঙ্গির মতো বিষয়ে মতপার্থক্যও পারিবারিক ভাঙনের কারণ হতে পারে। এছাড়া পরিবারের প্রবীণ সদস্যদেরকে গুরুত্ব না দেবার ফলে এই সংখ্যাটি ক্রমান্বয়ে কেবল বাড়ছেই! যুক্তরাস্টের মতো উন্নত রাস্ট্রে প্রায় ৩৮ শতাংশ পরিবার হরহামেশাই ভেঙ্গে যাচ্ছে। কোনো এক পরিসংখ্যানে দেখা যায় বর্তমানে আমাদের দেশেও নগরের জনসংখ্যা প্রায় ২৫ শতাংশ। গত দুই দশকে নগরায়ণ, শিল্পায়ন, দারিদ্র্য, বেকারত্ব ও উন্নত জীবনযাত্রার আকাঙ্ক্ষায় অনেক মানুষ গ্রাম থেকে শহরে এসেছে। এদিকে গ্রামগুলোয় যে পরিবারগুলো ছিল, তার ধারণাও পাল্টে গেছে। ফলে ধীরে ধীরে হারিয়ে ফেলছি যৌথ পরিবারের সুবিধা, ঐতিহ্য এবং সেই সঙ্গে সামাজিক বন্ধন। ফলে পরিবারের সদস্যদের মধ্যে আন্তরিকতা, মমতা, স্নেহ, ভালোবাসা ও শ্রদ্ধাবোধ কমে যাচ্ছে। জরিপ অনুযায়ী বাংলাদেশের যৌথ পরিবারের সংখ্যা এখন ১০ শতাংশে নেমে আসছে। বিবিএস প্রতিবেদনে দেখা গেছে, দেশে মোট পরিবার সংখ্যা ৪ কোটি ১০ লাখ ১০ হাজার ৫১ জন এবং খানার গড় আকার ৪ জন। এক দশক আগে খানার সংখ্যা ছিল ৩ কোটি ২১ লাখ ৭৩ হাজার ৬৩০ জন। পরিবারের আকার ছিল সাড়ে ৪ জন। অর্থাৎ পরিবারের আকার ছোট হচ্ছে। পরিবারের সংখ্যা বাড়ছে ৮৮ লাখ ৩৬ হাজার ৪২১টি। ঢাকার মতো রাজশাহীতেও ছোট হচ্ছে পরিবারের আকার যা মাত্র ৩.০৮ জন। এছাড়া রংপুরে পরিবারের আকার ৩.০৯, খুলনায় ৩.০৯, বরিশালে ৪.০১, চট্টগ্রামে ৪.০৪ এবং ময়মনসিংহে ৪ জন। সুতরাং দেখা যাচ্ছে খানা বা পরিবার প্রতি জনসংখ্যা ৪–এর নিচে। যৌথ পরিবার ভেঙ্গে যাবার কারণে পারিবারিক মূল্যবোধের অবক্ষয় দেখা দিচ্ছে। আর এভাবেই আমাদের পরিবারসমূহের কলুর বলদ খ্যাত “প্রিয়জন নামক প্রয়োজনীয় ব্যক্তিটি” প্রতিটি পদক্ষেপে হোঁচট খেতে খেতে প্রিয় পরিবারের কাছ থেকেও মুখ ফিরিয়ে নিতে চায় কোনো একদিন। সুতরাং, পারিবারিক মূল্যবোধের যেমন কোনো বিকল্প নেই ঠিক তেমনি নি:স্বার্থ ভালোবাসার চর্চা করাটা খুবই জরুরি। পরিবারে যার অবদান খুবই নগন্য তাঁকেও সমান গুরুত্ব ও সম্মান প্রদর্শন করা প্রত্যেক প্রিয়জনের নৈতিক দায়িত্বও বটে! নয়তো, কোনো এক সময়ে আমাদের প্রত্যেককে পরিবারের কাছে কেল প্রিয়জন না হয়ে প্রয়োজন হয়ে বাঁচতে হবে!
লেখক:
মো: তানজিমুল ইসলাম
কলামিস্ট ও উন্নয়নকর্মী