শনিবার, ০৪ এপ্রিল ২০২৬, ০৪:৫৩ পূর্বাহ্ন
তানজিমুল ইসলাম
লেখক ও কলামিস্ট
১৯৪৭ থেকে ২০২৬ সাল। এই ৭৮ বছরে ”বাংলাদেশ” নামক এই ছোট্ট ভূখন্ডটির মানুষেরা আবহমান কাল ধরেই নানা ঘটনার সাক্ষী। তৎকালীন সভ্যতার পুরোধা ইংরেজদের সিদ্ধান্তে বাঙলা ভাষাভাষির জনগণ সত্ত্বেও ভারতবর্ষের নাগরিক থেকে ১৯৪৭ পরবর্তী পাকিস্তানী অর্থাৎ পূর্ব পাকিস্তানী পরিচয় নিয়ে বাঁতে শেখা! ১৯৫২ সালেই আবার একই রাষ্ট্রের কর্তৃপক্ষের সাথে বাংলা ভাষার অস্তিত্বকে টিকিয়ে রাখবার জন্য যুদ্ধে জড়িয়ে যাওয়া ও জয়লাভ করা। পরবর্তীতে বাঙ্গালীদের জাতিগত স্বার্থ রক্ষা করবার জন্য ’৫৪, ’৬৬, ’৬৯, এবং ’৭১- এ মুক্তিযুদ্ধের মাধ্যমে যার চুড়ান্ত রুপ নেয়! জাতি-ধর্ম-লিঙ্গ-বর্ণ-নির্বিশেষে এদেশের আমজনতার সমষ্টিগত দৃঢ়তার ফলে অপেক্ষাকৃত অদক্ষ, নিরস্ত্র, শোষিত শ্রেণী সত্যিই তাই সেদিন বিজয়ের মুকুট ঠিক ছিনিয়ে এনেছিল। পৃথিবীর মানচিত্রে পতাকার বুকে লাল সূর্য চিহ্নিত ছবিটি দেখলেই এদেশের খেটে খাওয়া আমজনতাও গর্ব বোধ করে! অনেক চড়াই উৎরাই পেরিয়েও বারবার বিপদগ্রস্ত হওয়া এদেশের অতি সাধারন মানুষ স্বাধীন-সার্বভৌমত্বকে টিকিয়ে রাখবার জন্য সত্যিই দৃঢ় প্রত্যয়ী বটে! এমনি করেই আমজনতার রায়কে পুঁজি করে বিভিন্ন রাজনৈতিক দলসমূহ রাস্ট্র পরিচালনার দায়িত্ব হাতে নিলেও প্রকৃত পক্ষে খেটে খাওয়া মানুষের ভাগ্যের পরিবর্তন কতটুকু হয়েছে তা তো আপেক্ষিক! গণতান্ত্রিক এই দেশে এভাবেই প্রতি পাঁচ বছর পরে আমজনতার ভোটাধিকারের ভিত্তিতে সরকার গঠনের কথা অনিবার্য কারণে ইতোপূর্বে তার ব্যত্যয় ঘটেছে! গণতন্ত্রের মূলনীতি অনুযায়ী জনগনই যেখানে সকল ক্ষমতার উৎস, সেখানে জনসাধারনের রায়ের প্রতি তোয়াক্কা না করাটা এক প্রকার অ-গণতান্ত্রিকই বটে! অবশেষে ১২ ফ্রেব্রুয়ারি ২০২৬ বহুল প্রতীক্ষিত ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠিক হলো। দু’একটি বিচ্ছিন্ন ঘটনা ছাড়া মোটামুটি শান্তিপূর্ণভাবেই নির্বাচনের এই উৎসব সুসম্পন্ন হয়।
টেকনাফ থেকে তেঁতুলিয়ার স্বপ্নে বিভোর সকল বাংলাদেশী জনগণ অনেক প্রত্যাশা তাকিয়ে আছে: নতুন নির্বাচিত সরকার রাজনীতি, অর্থনীতি, সমাজনীতি—সর্বোপরি একটি গণতান্ত্রিক এবং স্থিতিশীল শাসনব্যবস্থার জন্য গুরুত্বপূর্ণ ভুমিকা রাখবে। প্রতিটি ক্ষেত্রে সামাজিক বিশৃঙ্খলা নিয়ন্ত্রণে আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতির উন্নতি এবং জাতীয় অর্থনীতি পুনরুদ্ধারের জন্য কার্যকরী পদক্ষেপ গ্রহণ করবে। এদেশের মোট জনসংখ্যার প্রায় এক-তৃতীয়াংশ অর্থাৎ ৩৫ শতাংশ যেখানে শিশু, সেখানে বর্তমান সরকার নিশ্চয়ই শিশুদেরে উন্নয়নের কথা ভাববে সর্বাগ্রে! টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রার প্রতিটি সূচকে নিবিড়িভাবে কাজ করবার জন্য সমন্বিত উদ্যোগ গ্রহণ করতে হবে। এদেশে শিশুদের জন্য নানা রকম কর্মসূচি বাস্তবায়ন করে এমন জাতীয় ও আন্তর্জাতিক এন.জি.ও. সমূহের সাথে সমন্বয় সাধন করে এগিয়ে যেতে হবে। প্রয়োজনে, আন্তর্জাতিক দাতা সংস্থাসমূহের সাথে কার্যকরী সম্পর্ক গড়ে তোলা এখন সময়ের দাবি।
প্রতিটি ক্ষেত্রে অতীত থেকে শিক্ষা নিয়ে সামনের দিকে এগিয়ে যাবার গঠনমূলক পরিকল্পনা ও বাস্তবায়নের দৃঢ় প্রত্যয়ী হতে হবে। বাংলাদেশের অনেগলো সমস্যার মধ্যে অন্যতম প্রধান সমস্যা সামাজিক নিরাবপত্তা, আইন শৃঙ্খলা পরিস্থিতির বেহাল দশা, মুদ্রাস্ফীতি, দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতি, দুর্নীতি, সিন্ডিকেট, ঋণখেলাপি, অর্থ পাচার ও ডলার-সংকট। নতুন সরকারকে নানারকম কূটনৈতিক, অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক ক্ষেত্রে এসব চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করতে হবে। দেশের অর্থনীতির ভিত বেজায় নড়বড়ে। রিজার্ভ সংকট, উচ্চ মুদ্রাস্ফীতি ও ডলারের দাম অস্বাভাবিক বৃদ্ধি, দেশের অর্থনীতিতে বড় সংকট সৃষ্টি করেছে। মার্কিন ডলারের বিপরীতে স্থানীয় মুদ্রা ক্রমশ অবমূল্যায়িত হচ্ছে যা কোনোভাবেই নিয়ন্ত্রণ করা যাচ্ছে না। বাংলাদেশ ব্যাংকের হিসাব মতে, গত দেড় বছরে ডলারের দাম ২০ শতাংশেরও বেশি বৃদ্ধি পেয়েছে। খবরে প্রকাশ, ২০২৪-২৫ অর্থবছরে প্রবৃদ্ধির হার ৫.৮ শতাংশ এবং মূল্যস্ফীতি বৃদ্ধি পেতে পারে বলে বিশ্বব্যাংক জানিয়েছে। এদিকে দেশে ডলার-সংকট প্রকট। সেখানেও থাবা মেরেছে সিন্ডিকেট চক্র। নিয়ন্ত্রণে আনা না গেলে দেশ গভীর সংকটে নিপতিত হবে। ব্যাংক খাতে এখনো সুশাসন প্রতিষ্ঠা করা যায়নি। এখানে ব্যাপক অনিয়ম, নৈরাজ্য, অব্যবস্থাপনা বেড়েছে অনেক গুণ। ব্যাংক খাতের অনিয়ম ব্যাপক সমালোচিত হওয়ায় সরকারের সুনাম ক্ষুন্ন হয়েছে।
এদেশের জনগোষ্ঠীর বিশাল অংশ দারিদ্র্যসীমার নিচে বাস করে। দ্রব্যমূল্যের চরম ঊর্ধ্বগতি, জীবনযাত্রার ব্যয় মেটাতে দিশেহারা সীমিত আয়ের সাধারণ মানুষ। ফলশ্রুতিতে সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রা কঠিন হয়ে উঠেছে। সিন্ডিকেটের কুচক্রী মহলের কারণে দেশের বাজারগুলোতে পর্যাপ্ত সরবরাহ থাকার পরও নিত্যপ্রয়োজনীয় দ্রব্যের বাজার দফায় দফায় অস্থির। বিশ্ববাজারে পণ্যের মূল্য হ্রাস পেলেও কমছে না দেশে। আসন্ন রমজানকে উপলক্ষ্য করে দুষ্টচক্র যাতে বেপরোয়া হয়ে না উঠতে পারে, সেদিকে মনোযোগ দিতে হবে। সাধারণ মানষের চাহিদা পেটপুরে দুমুঠো খাবার। কিন্তু এখন তাদের নুন আনতে পান্তা ফুরোয়। আমজনতার প্রত্যাশা—এসব সংকটের উত্তরণ ঘটিয়ে জনমনে স্বস্তি ফিরিয়ে আনবে নতুন সরকার।
বিদেশে অর্থ পাচার এদেশে অন্যতম প্রধান সমস্যা যা কিছুতেই রোধ করা যাচ্ছে না। পত্রপত্রিকায় প্রকাশিত সংবাদ সূত্রে জানা যায়, গত ৫০ বছরে দেশ থেকে প্রায় ১২ লাখ ২ কোটি টাকা পাচার হয়েছে। আইনের সঠিক প্রয়োগ না হওয়ায় দুর্নীতিবাজরা দিনদিন বেপারোয়া হয়ে উঠেছে। এছাড়া মাদক যেন অপরাধের দুষ্টচক্র হিসেবে দেখা দিয়েছে। প্রয়োজনে আইন সংশোধন করে কঠোর আইনের মাধ্যমে এসব অপরাধ রোধে অবিলম্বে বিশেষ ব্যবস্থা নেওয়া সরকারের নৈতিক দায়িত্ব। সুশাসন প্রতিষ্ঠা করে মাদক ও দুর্নীতি দমন হবে সরকারের বড় দায়িত্ব। সরকার এখনো পর্যন্ত সব খাতে সুশাসন প্রতিষ্ঠা করতে পারেনি। স্বচ্ছতা, জবাবদিহিতা, সুনিশ্চিত করার লক্ষ্যে দুদক, রাজস্ব বোর্ড ও বাংলাদেশ ব্যাংকেরসহ অন্যান্য রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানে কাঠামোগত সংস্কার এনে সক্ষমতা বৃদ্ধি করতে হবে।
প্রতিবছরের মতো আবারও আগামী জুনে (২০২৬-২৭) অর্থবছরের বাজেট ঘোষণা করবেন নতুন অর্থমন্ত্রী। এবার অর্থবছরে সরকারের ব্যয়ের লক্ষ্যমাত্রা কত ধার্য করা হবে, তা এখনো সুস্পষ্ট নয়। বাংলাদেশের পট পরিবর্তনের রেশ কাটতে না কাটতেই বিশ্বব্যাপী অর্থনৈতিক মন্দা ইস্যু নতুন করে ভাবাচ্ছে। বাংলাদেশের মতো নামমাত্র উন্নয়নশীল দেশটিতেও লাগামহীন অর্থনীতির কুপ্রভাব পড়েছে! অর্থনীতিবিদ, ব্যক্তিগত করদাতা ও করপোরেট সেক্টর বাংলাদেশের আশা-আকাক্ষাগুলোর সম্ভাবনা জোগালেও এ ক্ষেত্রে নতুন সরকারের ব্যাপক দক্ষ ভূমিকার পরিচয় দিতে হবে। এ দেশের প্রকৃত করদাতাদের প্রত্যাশা আসলে কী এবং কারা কর ফাঁকি দিতে সোচ্চার, সরকারের পক্ষে এ তথ্য জানা খুব কঠিন কিছু নয়। জাতীয় বাজেটে শুধু পুঁজিবাদের স্বার্থ বিবেচনা করা উচিত, নাকি আমজনতার বিষয়ে নজর দেওয়া উচিত- সেটি সরকারকে আন্তরিকতার সাথে ভাবতে হবে। এর পাশাপাশি বিদেশি দাতা সংস্থায় কর্মরত স্বল্পমেয়াদি বেতনভুক্ত কর্মীদের কর ছাড় দেওয়া প্রয়োজন বলে মনে করা হচ্ছে। করোনা মহামারী-পরবর্তী বাংলাদেশেও যে বিশ্ববাজারের প্রভাব পড়েছে, এদিকে সরকারের খেয়াল রাখতে হবে। জাতীয় বাজেটের আগে আমজনতার স্বার্থে যেগুলো খুবই বিবেচ্য বিষয়, তা হলো অধিকাংশই বিশ্বাস করেন- আসন্ন বাজেটে ব্যক্তিগত কর আরোপের জন্য সবচেয়ে বেশি সংস্কার প্রয়োজন। জাতীয় বাজেট প্রণয়নের আগে সরকারের প্রয়োজন সম্পদশালীদের প্রতি বিশেষ নজরদারি করা। সরকারের প্রয়োজন স্টক মার্কেটে খেয়াল রাখা। নানাবিধ কারণে চরম সংকটে স্বাস্থ্য ও শিক্ষা বিভাগ। এই পরিস্থিতিতে সরকারের প্রয়োজন স্বাস্থ্য ও শিক্ষাবীমার ওপর গুরুত্ব আরোপ করা। এ দেশের ব্যাংকিং সেক্টরের ওপর গুরুত্ব আরোপ করা খুব বেশি প্রয়োজন। এ ছাড়া সরকারের প্রয়োজন কল-কারখানা ও গ্রামীণ এলাকার ওপর নজর দেওয়া। এখানেই শেষ নয়, এ দেশের হসপিটাল সেক্টরের ওপর গুরুত্ব আরোপ করা অত্যন্ত প্রয়োজন। জিডিপি লক্ষ্য করে বাজেট না করে, বরং কর্মসংস্থানভিত্তিক বাজেট বরাদ্দ করা উচিত। সরকারের উচিত দুস্থ মানুষের জন্য খাদ্য ও নগদ অর্থ সহযোগিতা করা। এ মুহূর্তে শিশু সুরক্ষা নিশ্চিত করতে বাল্যবিয়ে, শিশুশ্রম, অপুষ্টি, খাদ্য নিরাপত্তা ও ঝরে পড়া রোধে কাজ করা উচিত! অল্প আয়ের মানুষদের পাশাপাশি এন.জি.ও কর্মীদের পরিবারের কথাও ভাবা উচিত খুব জোরেসোরে। শিক্ষার ক্ষেত্রে সর্বোচ্চ বরাদ্দ রাখা উচিত, বিশেষ করে আদিবাসীদের জন্য শিক্ষার জন্য ঋণের ব্যবস্থা করা। ধান-চালের দামে ন্যায্যতা প্রয়োজন। শ্রমিকদের সুরক্ষা কাঠামোর আওতায় আনা উচিত, বিশেষ করে তাদের জন্য বীমা নিশ্চিত করা। সরকার নিশ্চয়ই একমত হবে যে শিক্ষা ও শিশুর উন্নয়ন খাতে কেবল বাজেট বরাদ্দ করলেই হবে না, বরং এর বাস্তবায়ন বেশি জরুরি। দুঃখজনক হলেও সত্যি, আমরা এখনো জানি না কীভাবে শিশুশ্রম ও শিশুবিয়ে বন্ধ করব? কেননা এর সঙ্গে অনেক বিষয় খুব সম্পর্কযুক্ত। গড়ের বাজেটে গড়ের আনন্দে থাকার সময় এখন আমাদের নেই! কারণ আমাদের মনে রাখা উচিত, ‘নো ওয়ান লেট বিহাইন্ড!’ বিগত সরকার একত্রে মহিলা ও শিশুবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের কথা বললেও বাস্তবে সিংহভাগ অধিদফতরই হলো ‘মহিলা বিষয়ক’। তাই শিশুর উন্নয়ন ত্বরান্বিত করতে হলে শিশুর জন্য পৃথক বাজেট লাইন থাকা অত্যাবশ্যকীয়! এটি সুস্পষ্ট যে, বাজেট সম্পর্কে সচেতন হলে জনগণকে তার অধিকারে সচেতন হতে হবে। এ জন্য প্রত্যেক নাগরিককে তথ্য সমৃদ্ধ হতে হবে। একই সঙ্গে পিছিয়ে পড়া মানুষের কণ্ঠস্বর সুদৃঢ় করতে চাইলে সর্বাগ্রে প্রয়োজন নাগরিক সমাজের কণ্ঠস্বর সুদৃঢ় করা। তবেই হয়তো জাতীয় বাজেটের সুফল পাবে ‘আমজনতা’ নামক এ দেশের খেটে খাওয়া সাধারণ মানুষ। আর এভাবেই বাক স্বাধীনতা ও উৎসবমুখর নির্বাচনে নতুন সরকারে নিরংকুশ বিজয়ের মাধ্যমেই জয় হবে আমজনতার!