বৃহস্পতিবার, ০৭ মে ২০২৬, ০৬:১৭ অপরাহ্ন
রিজেন্সি ডেভেলপারস্ কোম্পানি ও ভবন মালিক রোকেয়া বেগম গং রাজউককে বৃদ্ধাঙ্গুলী দেখিয়ে ১০ তলা পর্যন্ত নির্মাণ
নার্গিস রুবি:
রাজধানী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (রাজউক) জোনাল অফিস ৩/২–এর আওতাধীন বাড়ী-৩/খ, রোড-৪, বসতি হাউজিং, বড়বাগ, মিরপুর-২ এলাকায় ‘রিজেন্সি রোকেয়া টাওয়ার’ নামে একটি জি+৯ তলা বিশিষ্ট আবাসিক ভবনের নির্মাণকাজ চলমান।
অভিযোগ রয়েছে, অনুমোদিত নকশা অনুযায়ী নির্মাণের কথা থাকলেও বাস্তবে একাধিক ক্ষেত্রে নকশা ব্যত্যয় (ডেভিয়েশন) করে ভবনটি ১০ তলা পর্যন্ত উন্নীত করা হয়েছে।
রাজউকের অনুমোদিত স্মারক নং-২৫.৩৯,০০০০.০১৮.৩৩.১৩৬১.২২ অনুযায়ী প্রকল্পটির কাজ শুরু হয় ১০ মার্চ ২০২৩ এবং সমাপ্তির সম্ভাব্য তারিখ ১০ মার্চ ২০২৬। প্রকল্পের মালিক হিসেবে উল্লেখ রয়েছে রোকেয়া বেগম গং এবং নির্মাণকারী প্রতিষ্ঠান রিজেন্সি ডেভেলপারস্ লিঃ। জমির অবস্থান সিএস দাগ নং-৬৯৮ ও ৬৯৯, আরএস দাগ নং-১৩৪০৫ এবং এমএস দাগ নং-৪১০৬৩ হিসেবে নথিভুক্ত। প্রকৌশলী হিসেবে মোঃ সামিউল ইসলাম (IEB Reg. No-F-09794) এবং স্থপতি হিসেবে মোঃ তাইফুর রহমান (MIAB R-170, Rajuk Reg. No-R-170) দায়িত্বে রয়েছেন।
নকশা ব্যত্যয় ও নিরাপত্তা ঝুঁকি:
স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, ভবনের চারপাশে নির্ধারিত সেটব্যাক বা খালি জায়গা রক্ষা করা হয়নি। অতিরিক্ত ফ্লোর সংযোজন ছাড়াও পাশবর্তী ভবনের সাথে দূরত্ব কমিয়ে নির্মাণকাজ এগিয়ে নেওয়া হয়েছে বলে অভিযোগ রয়েছে। এতে অগ্নিনিরাপত্তা, বায়ু চলাচল ও আলো প্রবেশে বাধা সৃষ্টি হওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।
নির্মাণস্থলে দায়সারাভাবে সেফটি নেট ব্যবহার করা হলেও তা শ্রমিক ও পথচারীদের জন্য যথেষ্ট নিরাপদ নয় বলে অভিযোগ উঠেছে।
নির্মাণ সামগ্রী নিচে পড়ে যাওয়ার ঝুঁকি থাকায় এলাকাবাসী উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন। ইমারত নির্মাণ বিধিমালা অনুযায়ী উচ্চ ভবনে মানসম্মত সেফটি ব্যবস্থাপনা, সুরক্ষা ব্যারিকেড ও পর্যাপ্ত নিরাপত্তা সরঞ্জাম ব্যবহার বাধ্যতামূলক।
রাজউকের বক্তব্য ও প্রশ্ন:
রাজউকের অথরাইজড অফিসার মাসুক আহমেদ ও ইমারত পরিদর্শক আলীনূর সাংবাদিকদের জানিয়েছেন, ভবনটিতে নকশা ব্যত্যয় রয়েছে এবং দ্রুত উচ্ছেদ অভিযান পরিচালনা করা হবে। তবে স্থানীয়দের প্রশ্ন, নির্মাণকাজ শুরু থেকে ১০ তলা পর্যন্ত পৌঁছানো পর্যন্ত কেন দৃশ্যমান কোনো আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়নি?
ইমারত নির্মাণ আইন ও বিধিমালা অনুযায়ী, অনুমোদিত নকশা লঙ্ঘন করে ভবন নির্মাণ করলে সংশ্লিষ্ট ডেভেলপার ও মালিকের বিরুদ্ধে জরিমানা, নির্মাণ স্থগিতাদেশ, এমনকি অবৈধ অংশ ভেঙে ফেলার নির্দেশ দেওয়ার বিধান রয়েছে। কিন্তু এ ক্ষেত্রে এখন পর্যন্ত কার্যকর ব্যবস্থা না নেওয়ায় দায়িত্বে অবহেলার অভিযোগ উঠেছে।
ভবন মালিকের প্রতিক্রিয়া:
ভবন মালিকের সাথে যোগাযোগ করা হলে তিনি বলেন, “আমার ভবনের নকশার ব্যত্যয় আছে কি না, সেটা রাজউক বুঝবে। সাংবাদিকের এখানে কাজ কী? আমি এখন ব্যস্ত আছি।” তার এমন বক্তব্য জনমনে আরও প্রশ্নের জন্ম দিয়েছে।
নগর পরিকল্পনা ও জনস্বার্থের প্রশ্ন:
বিশেষজ্ঞদের মতে, ঢাকায় অনিয়ন্ত্রিত ও নিয়মবহির্ভূত নির্মাণ নগর ব্যবস্থাপনায় দীর্ঘমেয়াদি সংকট তৈরি করছে। অনুমোদিত নকশা উপেক্ষা করে অতিরিক্ত তলা নির্মাণ বা সেটব্যাক লঙ্ঘন ভবিষ্যতে ভূমিকম্প ঝুঁকি, অগ্নিকাণ্ড ও অবকাঠামোগত চাপ বাড়াতে পারে। বিশেষ করে মিরপুরের মতো ঘনবসতিপূর্ণ এলাকায় এমন নির্মাণ কার্যক্রম জননিরাপত্তার জন্য হুমকি হয়ে উঠতে পারে।
নগর পরিকল্পনাবিদরা বলছেন, রাজউকের নিয়মিত মনিটরিং ও তাৎক্ষণিক আইনগত পদক্ষেপ না থাকলে এ ধরনের অনিয়ম বাড়তেই থাকবে। একই সঙ্গে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত করা জরুরি।
মিরপুর-২ এর বসতি হাউজিং এলাকায় নির্মীয়মাণ ‘রিজেন্সি রোকেয়া টাওয়ার’ প্রকল্পে নকশা লঙ্ঘনের অভিযোগ শুধু একটি ভবনের বিষয় নয়; এটি নগর শাসন ও আইনের প্রয়োগ নিয়ে বৃহত্তর প্রশ্ন তুলে ধরেছে। এখন দেখার বিষয়, সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ দ্রুত তদন্ত ও আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণ করে কি না এবং নগরবাসীর নিরাপত্তা ও পরিকল্পিত উন্নয়ন কতটা নিশ্চিত করতে পারে।