রবিবার, ১০ মে ২০২৬, ০৭:০৪ অপরাহ্ন

শিরোনামঃ
ক্যাম্প ন্যু-তে মহাকাব্যিক সমীকরণ: চিরশত্রুকে হারিয়েই কি শিরোপার রাজতিলক পরবে বার্সেলোনা? মা- এক অক্ষরের অনন্ত আশ্রয় একটি দেওয়াল, একটি সিদ্বান্ত স্বপ্ন ভেঙে দিলো শতাধিক পরিবারের। শরণখোলায় ভিজিএফ চাল বিতরণে অনিয়মের বিরুদ্ধে বিক্ষোভ করেছেন কার্ড ধারী জেলেরা। রাজশাহীতে ১০০০ পিচ ইয়াবা সহ যুবক গ্রেফতার আন্তর্জাতিক মে দিবসে মোরেলগঞ্জে শ্রমিক দলের উদ্যোগে বর্নাঢ্য র‌্যালী ও আলোচনা সভা মিরপুর রিয়েল এস্টেট ফোরামের পক্ষ থেকে সংরক্ষিত নারী আসনের সকল সংসদ সদস্যকে অভিনন্দন। খাউলিয়া ইউনিয়ন উন্নয়নে চেয়ারম্যান প্রার্থী হিসেবে আলোচনায় আবু সালে খান বেঁচে থাকার পথ, না নতুন ফাঁদ? জলবায়ু-প্রভাবিত অভিবাসনে ঢাকার বাস্তবতা নবনির্বাচিত রিহ্যাব পরিচালনা পরিষদকে অভিনন্দন জানিয়েছেন – মোঃ জাকির হোসেন।

মা- এক অক্ষরের অনন্ত আশ্রয়

 

লেখক: রাজু উইলিয়াম রোজারিও,

কলামিস্ট ও উন্নয়ন বিশেষজ্ঞ!

বাংলা অভিধানে এক বর্ণের শব্দ খুব বেশি নেই। যেমন- ও, এ, ই, উ, আ ইত্যাদি। এগুলোর কিছু সর্বনাম, কিছু অব্যয় বা ধ্বনি হিসেবে ব্যবহৃত হয়। যেমন- “ও ছেলে আমার বন্ধু”, “এ বইটি ভালো”, “উ!” ব্যথার ধ্বনি, কিংবা “আ!” বিস্ময়ের প্রকাশ।

আমি ভাবছিলাম, “মা” কি এক বর্ণের শব্দ? আসলে “মা” এক বর্ণের নয়; এটি এক অক্ষরের শব্দ, কিন্তু দুই বর্ণের সমন্বয়ে গঠিত। এখানে “ম” একটি ব্যঞ্জনবর্ণ এবং ‘আ-কার’ একটি স্বরচিহ্ন। বাংলা ব্যাকরণ অনুযায়ী “মা” গঠিত হয়েছে “ম + আ” থেকে। তাই এটি এক অক্ষরের হলেও এক বর্ণের নয়।

“মা”-এর মতো বাংলা ভাষায় আরও অনেক এক অক্ষরের কিন্তু একাধিক বর্ণে গঠিত শব্দ আছে- না, যা, তা, বা, পা, চা, খা, দা, নে, দে, কে, সে, তো, রে ইত্যাদি। কিন্তু “মা” শব্দটির মতো শক্তিশালী, আবেগময় ও গভীর অর্থবহ শব্দ খুব কমই আছে। “মা” শব্দের মধ্যেই যেন লুকিয়ে আছে ভালোবাসা, স্নেহ, মমতা, নিরাপত্তা, আশ্রয়, নির্ভরতা, কোমলতা, ত্যাগ, ধৈর্য, সহনশীলতা ও আশীর্বাদ।

পৃথিবীর যে ভাষাতেই ডাকা হোক না কেন, একজন সন্তানের কাছে “মা” সবচেয়ে নিরাপদ আশ্রয়ের নাম।
মা দিবসের ইতিহাস মূলত মায়েদের প্রতি ভালোবাসা, শ্রদ্ধা ও ত্যাগকে স্মরণ করার আন্দোলন থেকে এসেছে। প্রাচীন গ্রিসে মাতৃদেবী রিয়ার সম্মানে উৎসব পালিত হতো। একইভাবে প্রাচীন রোমে মাতৃদেবী সিবিলেকে কেন্দ্র করে ধর্মীয় অনুষ্ঠান অনুষ্ঠিত হতো। এসব আয়োজনের মূল উদ্দেশ্য ছিল মাতৃত্বকে সম্মান জানানো।
আধুনিক মা দিবসের সূচনা হয় যুক্তরাষ্ট্রে। এ দিবসটির প্রচলনের পেছনে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ নাম আনা জার্ভিস। তিনি তাঁর মা অ্যান রিভস জার্ভিসের স্মৃতিকে সম্মান জানাতে ১৯০৮ সালে প্রথম আনুষ্ঠানিকভাবে মা দিবস পালন করেন। অ্যান রিভস জার্ভিস ছিলেন একজন সমাজসেবী নারী, যিনি মায়েদের মর্যাদা প্রতিষ্ঠায় কাজ করেছিলেন। তাঁর মৃত্যুর পর কন্যা আনা জার্ভিস মায়ের স্মৃতিকে শ্রদ্ধা জানাতে এবং সব মায়ের প্রতি সম্মান প্রদর্শনের উদ্দেশ্যে মা দিবস প্রচলনের উদ্যোগ নেন।
পরবর্তীতে তাঁর প্রচেষ্টার ফলেই ১৯১৪ সালে মার্কিন প্রেসিডেন্ট উড্রো উইলসন মে মাসের দ্বিতীয় রবিবারকে জাতীয় মা দিবস হিসেবে ঘোষণা করেন। এরপর ধীরে ধীরে বিশ্বের বিভিন্ন দেশে দিবসটি ছড়িয়ে পড়ে। বাংলাদেশেও গত কয়েক বছরে বিশেষত শহরকেন্দ্রিক সমাজে মা দিবস পালন বেশ জনপ্রিয় হয়ে উঠেছে।

বিশ্বের বিভিন্ন দেশে মা দিবস ভিন্ন ভিন্নভাবে উদযাপিত হয়। যুক্তরাষ্ট্রে সন্তানরা মাকে ফুল, শুভেচ্ছা কার্ড ও উপহার দেয়, পরিবারের সঙ্গে সময় কাটায়। যুক্তরাজ্যে দিনটি “মাদারিং সানডে” নামে পরিচিত। জাপানে মাকে লাল কার্নেশন ফুল দেওয়া হয়, যা ভালোবাসা ও ত্যাগের প্রতীক। থাইল্যান্ডে এ দিবস জাতীয় আবেগের অংশ। মেক্সিকোতে গান, পারিবারিক ভোজ ও উৎসবের মাধ্যমে দিনটি উদযাপিত হয়। বাংলাদেশে মা দিবস এলেই সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে মাকে নিয়ে ছবি ও স্মৃতিচারণে টাইমলাইন ভরে ওঠে। কিন্তু মা দিবস শুধুমাত্র ছবি পোস্ট করার দিন নয়; এটি মায়ের ত্যাগ, স্নেহ, ভালোবাসা ও অবদানের প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশের দিন।
একটি প্রত্যন্ত গ্রামের ছোট্ট শিশুও হয়তো স্কুল থেকে ফেরার পথে একটি ফুল তুলে এনে মাকে বলে, “মা, তোমাকে ভালোবাসি।” আবার অনেক প্রাপ্তবয়স্ক মানুষ সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে মাকে নিয়ে রিল বানাতে ব্যস্ত থাকলেও বাস্তবে মায়ের পাশে বসতে, একসঙ্গে খাবার খেতে কিংবা দূরে থাকলে সারাদিনে অন্তত একবার ফোন করে খোঁজ নিতেও ভুলে যায়।

অনেকের কাছে মা দিবস আনন্দের হলেও, যাদের মা আর বেঁচে নেই, তাদের কাছে দিবসটি গভীর আবেগ ও শূন্যতার দিন। আমার মতো যাদের মা আর পৃথিবীতে নেই, তাদের কাছে এই দিনটি স্মৃতি, ভালোবাসা ও বেদনার মিশ্র অনুভূতির দিন। এই দিনে চারপাশে যখন মাকে নিয়ে আনন্দ ও শুভেচ্ছা দেখা যায়, তখন নিজের মায়ের স্মৃতিও গভীরভাবে মনে পড়ে। মায়ের সাথে ইহলোকে আর কোনদিন দেখা হবে না, মাকে আর ছোঁয়া হবে না, মায়ের পা ছুঁয়ে আর আশীর্বাদ নেওয়া হবে না, মায়ের সেই কপাল আর কাছে পাওয়া যাবে না, যেখানে স্নেহভরা চুমু আঁকা যেত। মাকে আর ফোন করা যাবে না, তাঁর হাতের রান্না আর খাওয়া হবে না, ভালোবেসে ডাকা হবে না- “মা…”, ডাকলেও মা আর কোনদিন সশব্দে উত্তর দেবে না। মা চলে যাওয়া মানেই এমন একজন মানুষকে হারানো, যিনি পৃথিবীতে অদ্বিতীয় এক আশ্রয় ছিলেন। মা দিবস তাই উদযাপনের দিন, কৃতজ্ঞতা জানানোর দিন। জীবিত মাকে কেউ ফুল, নিজের সময় ও ভালোবাসা দিয়ে সম্মান জানান, আবার মৃত মাকে কেউ স্মৃতি, প্রার্থনা ও শ্রদ্ধার মাধ্যমে স্মরণ করেন।

যদি একটু গভীরভাবে ভাবি, তবে বুঝতে পারি- একজন মা নিজের সুখ, স্বপ্ন ও আরাম বিসর্জন দিয়ে সন্তানের জন্য বেঁচে থাকেন। পৃথিবীর প্রতিটি মানুষের জীবনেই মায়ের আত্মত্যাগের কোনো না কোনো গল্প আছে।
আমি আমার মাকে দেখেছি, তিনি চব্বিশ বছর বয়সে স্বামী হারিয়েও নিজের ভবিষ্যৎ ও আনন্দ বিসর্জন দিয়ে অসম্ভব ত্যাগের মধ্য দিয়ে আমাদের মানুষ করেছেন। কষ্ট করে পড়াশোনা করিয়েছেন, মূল্যবোধ শিখিয়েছেন। গ্রামের দরিদ্র মা হোক কিংবা শহরের কর্মজীবী মা- সন্তানের মঙ্গলের জন্য তাঁরা অক্লান্ত পরিশ্রম করেন। অসুস্থ সন্তানের পাশে রাত জেগে বসে থাকেন, নিজের কষ্ট লুকিয়ে সন্তানের মুখে হাসি ফোটান। মায়ের আত্মত্যাগ সবসময় বড় কোনো ঘটনার মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়; ছোট ছোট কাজের মধ্যেও গাঁথা। সন্তান অসুস্থ হলে সারারাত জেগে থাকা, অভাবের সংসারেও সন্তানের স্বপ্ন বাঁচিয়ে রাখা, ভুল করলে শাসন করা আবার বুকেও টেনে নেওয়া- এসবই মায়ের নিঃস্বার্থ ভালোবাসার প্রকাশ।
একজন মা সন্তানের জন্য যা করেন, তার প্রতিদান পুরোপুরি দেওয়া কখনো সম্ভব নয়। তবে সন্তানের কিছু দায়িত্ব অবশ্যই আছে- মাকে যথাযথ সম্মান করা, তাঁর মতামতের মূল্য দেওয়া, নিয়মিত খোঁজ নেওয়া, প্রয়োজনের সময় পাশে থাকা এবং কখনো অবহেলা না করা। মায়ের প্রতি ভালোবাসা যেন শুধু মা দিবসের শুভেচ্ছায় সীমাবদ্ধ না থাকে। ব্যস্ততার মাঝেও মায়ের সঙ্গে কথা বলা, তাঁর পাশে বসা, অসুস্থ হলে সেবা করা এবং বৃদ্ধ বয়সে তাঁকে বোঝা মনে না করা- এগুলোই প্রকৃত দায়িত্ব।

অনেক মায়ের বড় স্বপ্ন থাকে, সন্তান যেন সৎ, মানবিক, সফল ও দায়িত্বশীল মানুষ হয়। সন্তান একজন ভালো মানুষ হলে মা সবচেয়ে বেশি শান্তি পান। মায়ের এই স্বপ্ন পূরণের মধ্য দিয়েও একজন প্রকৃত সন্তান হয়ে ওঠা যায়। মা শুধু একজন জন্মদাত্রী নন; তিনি সন্তানের প্রথম শিক্ষক, সবচেয়ে নিরাপদ আশ্রয় এবং নিঃস্বার্থ ভালোবাসার প্রতীক।

সবশেষে বলা যায়, মা দিবস আমাদের হৃদয়ে মানবিকতা, কৃতজ্ঞতা ও ভালোবাসার বোধ জাগিয়ে তোলে। তাই শুধু মা দিবসে নয়, এই বোধ প্রতিদিনই আমাদের মাকে ভালোবাসতে, সম্মান ও যত্ন করতে তাড়িত করুক। মায়ের ঋণ কখনো শোধ করা সম্ভব নয়। পৃথিবীর সকল মা ভালো থাকুন। যাঁরা পৃথিবী ছেড়ে চলে গেছেন, তাঁরা সন্তানের ভালোবাসা ও প্রার্থনা অনুভব করুন।

মা দিবস শুধু আনুষ্ঠানিকতায় নয়, প্রতিদিনের যত্ন, শ্রদ্ধা, ভালোবাসা ও দায়িত্ববোধে অর্ধবহ হয়ে উঠুক


আপনার মতামত লিখুন :

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *