সোমবার, ০৪ মে ২০২৬, ০৩:৩৬ অপরাহ্ন
শরণখোলা (বাগেরহাট) প্রতিনিধি
সামুদ্রিক মৎস্য সম্পদের প্রজনন ও সংরক্ষণে বঙ্গোপসাগরে শুরু হয়েছে ৫৮ দিনের সরকারি নিষেধাজ্ঞা। গত ১৫ এপ্রিল থেকে শুরু হওয়া এই অবরোধ আগামী ১১ জুন ২০২৬ পর্যন্ত বলবৎ থাকবে। তবে এই সময়ে কর্মহীন হয়ে পড়া উপকূলীয় জেলেদের জন্য বরাদ্দকৃত ভিজিএফ চাল বিতরণ নিয়ে বাগেরহাটের শরণখোলায় ব্যাপক অনিয়ম ও স্বজনপ্রীতির অভিযোগ উঠেছে। ওজনে চাল কম দেওয়া এবং প্রকৃত জেলেদের বাদ দিয়ে ‘অ-জেলে’দের তালিকায় অন্তর্ভুক্ত করায় মৎস্যজীবীদের মধ্যে চরম ক্ষোভ বিরাজ করছে।
আজ সোমবার (৪ মে) সকাল ১০টার দিকে রায়েন্দা ইউনিয়ন পরিষদের সামনে শতাধিক জেলে হাতে কার্ড নিয়ে বিক্ষোভ প্রদর্শন করেন। এসময় তারা চাল বিতরনে অনিয়মের বিরুদ্ধে বিভিন্ন স্লোগান দিতে থাকেন। এর আগে গতকাল রবিবারও অনেক মৎস্যজীবী জনপ্রতি ১০ কেজি করে চাল কম দেওয়ার অভিযোগ তুলে সরব হন।
উপজেলা মৎস্য দপ্তর সূত্রে জানা গেছে, শরণখোলা উপজেলায় নিবন্ধিত জেলের সংখ্যা ১২ হাজার ৪৫০ জন। অবরোধকালীন সমুদ্রগামী প্রতিটি জেলে পরিবারের জন্য মোট ৮০ কেজি চাল বরাদ্দ দিয়েছে সরকার, যা দুই কিস্তিতে (প্রতি মাসে ৪০ কেজি করে) বিতরণের কথা রয়েছে।
অনুসন্ধানে জানা গেছে, ৩ নং রায়েন্দা ইউনিয়নে চাল বিতরণে সবথেকে বেশি অনিয়ম হচ্ছে। ভুক্তভোগীদের অভিযোগ, ৪০ কেজির স্থলে তাদের দেওয়া হচ্ছে মাত্র ৩০ কেজি। এছাড়া সবথেকে বড় জালিয়াতি ধরা পড়েছে জেলে তালিকায়। নিবন্ধিত কার্ডের একটি বড় অংশই এমন ব্যক্তিদের দখলে যারা পেশায় জেলে নন। স্থানীয় প্রভাবশালী মহলের আশীর্বাদপুষ্ট হওয়ার সুবাদে তারা এই সরকারি সুবিধা ভোগ করছেন, অন্যদিকে বংশপরম্পরায় সাগরে মাছ ধরা প্রকৃত জেলেরা কার্ড না পেয়ে পরিবার-পরিজন নিয়ে মানবেতর জীবনযাপন করছেন।
রায়েন্দা বাজার এলাকার ঘাটে নোঙর করা ট্রলারে জাল বুনছিলেন এক প্রবীণ জেলে। ক্ষোভ প্রকাশ করে তিনি বলেন:
”আমরা বাপদাদার আমল দিয়ে সাগরে ভাসি। কিন্তু আমাগো কপালে কার্ড জোটে না। অথচ যারা কোনোদিন লোনা পানির ছোঁয়াও লাগায় নাই, তাগো পকেটে জেলে কার্ড। আমাগো নামে কার্ড থাকলেও অনেক সময় চাল চাইলে কয় ‘তালিকায় নাম নাই’। অবরোধে সাগরে যাওয়া নিষেধ, আমরা এখন খামু কী?”
উপজেলা নির্বাহী অফিসার (ইউএনও) মোঃ জাহিদ হাসান এ বিষয়ে কঠোর অবস্থান ব্যক্ত করে বলেন, “যদি কোনো অ-জেলে কার্ড ব্যবহার করে চাল উত্তোলন করে এবং প্রকৃত জেলেরা বঞ্চিত হয়, তবে তদন্ত সাপেক্ষে দ্রুত আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে। ওজনে কম দেওয়ার অভিযোগটি খতিয়ে দেখা হচ্ছে। কোনো অবস্থাতেই সরকারি সহায়তায় নয়ছয় বরদাস্ত করা হবে না।”
উল্লেখ্য, অনিয়মের কেন্দ্রবিন্দুতে থাকা ৩ নং রায়েন্দা ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান আজমল হোসেন মুক্তা বর্তমানে পলাতক থাকায় এ বিষয়ে তার কোনো বক্তব্য নেওয়া সম্ভব হয়নি।
উপকূলীয় এই জনপদের মানুষের দাবি, ইলিশসহ সামুদ্রিক মৎস্য সম্পদ রক্ষায় অবরোধ সফল করতে হলে প্রকৃত জেলেদের শনাক্ত করে পূর্ণাঙ্গ খাদ্য সহায়তা নিশ্চিত করতে হবে। অন্যথায়, সরকারি এই মহতী উদ্যোগ ভেস্তে যাওয়ার পাশাপাশি উপকূলের হাজার হাজার জেলে পরিবার দীর্ঘমেয়াদী সংকটে পড়বে।