বৃহস্পতিবার, ১৬ এপ্রিল ২০২৬, ০৩:০৭ পূর্বাহ্ন

শিরোনামঃ
চকরিয়ার জীবন বলি চ্যাম্পিয়ন চন্দনাইশ বরকলে শতবর্ষের বিশ্ব পুকুরের বলি খেলায় কানায় কানায় পরিপূর্ণ মাঠ নারী সাংবাদিককে হেনস্তার আলোচিত ঘটনায় রাজউকের ইমারত পরিদর্শক গ্রেপ্তার। রাজধানীর ইস্টার্ণ হাউজিং ২য় পর্বে উচ্ছেদ অভিযানে স্বজনপ্রীতির অভিযোগ: কিছু ভবনে ব্যবস্থা, কিছুতে রহস্যজনক নীরবতা দোহাজারীতে ব্রিটিশ আমলে নির্মিত সড়ক বেদখল হতে হতে আইলে রুপান্তরিত, পুনরুদ্ধার করলেন এসিল্যান্ড ঝন্টু বিকাশ চাকমা রাজশাহীকে নতুন করে সাজাতে চাই: রাসিক প্রশাসক সুন্দরবনে ‘আগে চাঁদা, পরে মধু’, দস্যুদের দাপটে বিপাকে মৌয়ালরা রাজধানীর মিরপুর-১ এর দারুসসালাম রোড এলাকায় নকশা লঙ্ঘন করে ১০ তলা ভবন নির্মাণ চিফ অব ফ্লাইট সেফটি পদে বিতর্কিত নিয়োগ: ক্যাপ্টেন আহমেদ ইমরানকে ঘিরে অনিয়ম, হয়রানি ও নিরাপত্তা ঝুঁকির গুরুতর অভিযোগ গোদাগাড়ীতে ককটেল তৈরির সরঞ্জাম উদ্ধার ক্ষয়ক্ষতি ১০ লক্ষাধিক টাকা চন্দনাইশের দোহাজারীতে ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডে ৪ দোকান পুড়ে ভষ্মিভূত

রাজধানীর ইস্টার্ণ হাউজিং ২য় পর্বে উচ্ছেদ অভিযানে স্বজনপ্রীতির অভিযোগ: কিছু ভবনে ব্যবস্থা, কিছুতে রহস্যজনক নীরবতা

 

অভিযোগের তীর অথরাইজড অফিসার এফ আর আশিক আহমেদ ও ইমারত পরিদর্শক আলমগীর হোসেনের বিরুদ্ধে

নার্গিস রুবি:

রাজধানীর পল্লবী ও ইস্টার্ন হাউজিং এলাকায় নিয়মবহির্ভূত ভবন উচ্ছেদের নামে’ স্বজনপ্রীতির গুরুতর অভিযোগ উঠেছে রাজধানী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (রাজউক)-এর দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে। অভিযোগের কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছেন রাজউকের মহাখালী জোন-৩/১-এর অথরাইজড অফিসার এফ. আর. আশিক আহমেদ এবং ইমারত পরিদর্শক মো. আলমগীর হোসেন। অভিযোগ উঠেছে, উচ্ছেদ অভিযানে বাছাই করে কিছু ভবনে ব্যবস্থা নেওয়া হলেও, স্পষ্ট অনিয়ম থাকা সত্ত্বেও কিছু ভবনকে রহস্যজনকভাবে এড়িয়ে যাওয়া হয়েছে।

প্রাপ্ত তথ্য অনুযায়ী, রাজউকের নির্মাণ অনুমোদন স্মারক নং ২৫.৩৯.০০০০.০৯৮.৩৩.১৭২৯.২২-এর আওতাধীন ভবন উচ্ছেদ করা হয়নি। সংশ্লিষ্ট ভবনটি জি.এ ফাউন্ডেশন লিমিটেড কর্তৃক নির্মিত এবং জমির মালিক আওলাদ হোসেন চৌধুরী গং, ঠিকানা: বাড়ি নং ২৫/৩, পল্লবী, মিরপুর-১২, ঢাকা।

গত ৮ এপ্রিল ২০২৬ তারিখে ইস্টার্ন হাউজিং এলাকায় একটি উচ্ছেদ অভিযান পরিচালনা করা হয়। সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, অভিযানে নেতৃত্ব দেওয়া কর্মকর্তারা এলাকায় একাধিক নকশা লঙ্ঘনকারী ভবনের সামনে দিয়েই অতিক্রম করেন, কিন্তু কোনো ধরনের মোবাইল কোর্ট পরিচালনা বা সতর্কতামূলক ব্যবস্থা গ্রহণ করেননি। ফলে অভিযানের উদ্দেশ্য ও কার্যকারিতা নিয়ে জনমনে প্রশ্ন তৈরি হয়েছে।

অভিযোগ রয়েছে, পল্লবীর ২৫/৩ নম্বর বাড়িতে জি.এ ফাউন্ডেশন লিমিটেডের নির্মিত ভবন, ইস্টার্ন হাউজিং দ্বিতীয় পর্বের ব্লক-এইচ, রোড এন-৩-এ পাটোয়ারী প্রপার্টিস লিমিটেডের নির্মাণাধীন স্থাপনা এবং প্লট নং ৩৫/৩৬, ঝিলপাড় মসজিদ সংলগ্ন একটি ভবনে স্পষ্ট নকশা লঙ্ঘন থাকা সত্ত্বেও কোনো ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি। অথচ একই অভিযানে অন্য কিছু স্থাপনায় দায়সারাভাবে অভিযান পরিচালনার অভিযোগ রয়েছে।

উল্লেখ্য, ঝিলপাড় মসজিদ সংলগ্ন প্লট নং ৩৫/৩৬-এর ভবনটি নিয়ে গত ১ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ তারিখে নকশা লঙ্ঘনের অভিযোগে সংবাদ প্রকাশিত হয়েছিল। সে সময় উচ্ছেদ অভিযানে ব্যবস্থা নেওয়ার কথা থাকলেও ৮ এপ্রিল ২০২৬ তারিখের অভিযানে অদৃশ্য কারণে কোনো ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়নি। এ বিষয়ে ভবন মালিকদের সঙ্গে কথা বললে তারা দাবি করেন, “উচ্ছেদের আগে রাজউকের কর্মকর্তাদের ম্যানেজ করা হয়েছে।”

স্থানীয় একাধিক সূত্র আরও দাবি করেছে, উচ্ছেদ অভিযানের আগেই সংশ্লিষ্ট ভবন মালিকরা রাজউকের কর্মকর্তাদের সঙ্গে ‘সমঝোতা’ করেছেন। এমনকি কয়েকজন ভবন মালিকের ভাষ্য অনুযায়ী, “অভিযানের আগে রাজউকের কর্মকর্তাদের ম্যানেজ করা হয়েছে”, যা অভিযানের স্বচ্ছতা নিয়ে গুরুতর সন্দেহের জন্ম দিয়েছে।

অভিযুক্ত কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে আরও অভিযোগ, স্বজনপ্রীতি রহস্যজনক পরিকল্পিতভাবে নির্দিষ্ট কিছু ভবনকে উচ্ছেদ কার্যক্রমের বাইরে রেখেছেন এবং পরবর্তীতে অন্য কিছু স্থাপনায় দায়সারাভাবে অভিযান পরিচালনা করেছেন। যদিও এ বিষয়ে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা অভিযোগ অস্বীকার করেছেন, তবে তাদের বক্তব্যের পক্ষে কোনো গ্রহণযোগ্য ব্যাখ্যা বা দৃশ্যমান প্রমাণ উপস্থাপন করতে পারেননি।

উল্লেখযোগ্যভাবে, একই জোন এলাকায় গত বছর মিরপুরের রূপনগর আবাসিক এলাকায় পরিচালিত এক অভিযানে এই কর্মকর্তারা তিনটি ভবনের নির্মাণকাজ বন্ধ করে প্রায় ৬ লাখ টাকা জরিমানা আদায় এবং একটি বৈদ্যুতিক মিটার জব্দ করেন। সেখানে ভবন মালিকরা নকশা দেখাতে ব্যর্থ হন বলে রাজউকের পক্ষ থেকে জানানো হয়। এই ঘটনার সঙ্গে পল্লবীর অভিযানের বৈপরীত্য আরও প্রশ্নের জন্ম দিয়েছে, কেন এক জায়গায় কঠোরতা, অন্য জায়গায় নীরবতা?

নগর পরিকল্পনাবিদদের মতে, এ ধরনের বাছাই করা অভিযান আইন প্রয়োগে বৈষম্য সৃষ্টি করে এবং অবৈধ নির্মাণকে পরোক্ষভাবে উৎসাহিত করে। এতে নগর পরিকল্পনার শৃঙ্খলা ভেঙে পড়ার পাশাপাশি সাধারণ মানুষের মধ্যে আইনের প্রতি আস্থাহীনতা বাড়ে। বিশেষ করে ২৩ জানুয়ারি ২০২৬ তারিখে জারিকৃত ‘রাজধানী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ অধ্যাদেশ, ২০২৬’-এ নকশা বহির্ভূত ভবন নির্মাণের জন্য সর্বোচ্চ ২ বছরের কারাদণ্ড বা ৫০ লাখ টাকা জরিমানা কিংবা উভয় দণ্ডের বিধান রাখা হয়েছে। এমন কঠোর আইনের উপস্থিতিতেও যদি নির্বাচিতভাবে অভিযান পরিচালিত হয়, তবে আইনের কার্যকারিতা প্রশ্নবিদ্ধ হয়ে পড়ে।

এদিকে স্থানীয় বাসিন্দারা প্রশ্ন তুলেছেন, আগে থেকেই চিহ্নিত নকশা লঙ্ঘনকারী ভবনগুলোর বিরুদ্ধে ব্যবস্থা না নেওয়ার পেছনে কী কারণ থাকতে পারে? তারা দ্রুত একটি নিরপেক্ষ তদন্ত কমিটি গঠন এবং দায়ীদের বিরুদ্ধে কঠোর শাস্তিমূলক ব্যবস্থা গ্রহণের দাবি জানিয়েছেন।

উল্লেখ্য, পল্লবীতে এর আগেও ২০২৫ সালের মার্চ মাসে রাজউক উচ্ছেদ অভিযান পরিচালনা করে অন্তত পাঁচটি ভবনের অবৈধ অংশ ভেঙে ফেলা হয়েছিল। তবে সর্বশেষ অভিযানে বাছাই করা পদক্ষেপের অভিযোগ নতুন করে বিতর্কের জন্ম দিয়েছে।

বিশ্লেষকরা বলছেন, রাজধানী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (রাজউক)-এর মতো একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠানে এ ধরনের অনিয়ম ও দুর্নীতির অভিযোগ নতুন নয়। অতীতেও অথরাইজড অফিসারদের বিরুদ্ধে ঘুষ গ্রহণ ও দায়িত্বে অবহেলার অভিযোগ উঠে এসেছে বিভিন্ন প্রতিবেদনে। ফলে বর্তমান ঘটনাটি শুধু বিচ্ছিন্ন নয়, বরং একটি গভীর প্রাতিষ্ঠানিক সমস্যার ইঙ্গিত বহন করে।

সার্বিকভাবে দেখা যাচ্ছে, উচ্ছেদ অভিযানের আড়ালে যদি দুর্নীতির অভিযোগ সত্য প্রমাণিত হয়, তবে তা শুধু প্রশাসনিক ব্যর্থতাই নয়, বরং একটি গুরুতর প্রাতিষ্ঠানিক সংকটের প্রতিফলন। তাই স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত করতে দ্রুত তদন্ত, দায়ীদের শাস্তি এবং প্রযুক্তিনির্ভর মনিটরিং ব্যবস্থা চালুর কোনো বিকল্প নেই, এমনটাই মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।


আপনার মতামত লিখুন :

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *