শনিবার, ২৭ জুন ২০২৬, ০১:১৩ পূর্বাহ্ন
এস.এম.জাকির,
চন্দনাইশ(চট্টগ্রাম)প্রতিনিধি:
শত প্রতিকূলতা ও রোগী সংকটের মাঝেও টিকে আছে চন্দনাইশের ঐতিহ্যবাহী জোয়ারা পাগলা গারদ।বর্তমানে পুরুষ-মহিলা ১০ জন রোগী চিকিৎসাধীন রয়েছে।
চট্টগ্রাম-কক্সবাজার মহাসড়কের বদুরপাড়া রাস্তার মাথা থেকে এক কিলোমিটার ভিতরে জোয়ারা গ্রামে ১৮৮০ সালে প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল দেশের একমাত্র আয়ুর্বেদিক পাগলা গারদটি।কবিরাজ গিরিন্দ্র চন্দ্র দাশ তার নিজ বাড়িতে প্রায় ১ একর জমির উপর সরকারি অনুমোদন নিয়েই সে সময় ‘কমলা ঔষধালয়’ নামে একটি আয়ুর্বেদিক প্রতিষ্ঠান ও তৎসংলগ্ন পাগলা গারদটি প্রতিষ্ঠা করেছিলেন।একই সাথে কবিরাজ চিত্ত রঞ্জন দাশ দামোদর ঔষধালয় ও পাগলাগারদ প্রতিষ্ঠা করেন। পরবর্তীতে এ প্রতিষ্ঠান নিশি বৈদ্যের বাড়ি হিসেবে পরিচিতি লাভ করে।মানব সেবার মহান ব্রত নিয়ে প্রতিষ্ঠিত এ আয়ুর্বেদিক দামোদর ঔষধালয় হাসপাতালে এখনো চলছে চিকিৎসা কার্যক্রম।দীর্ঘ ১৪৬ বছর আগে প্রতিষ্ঠিত এ হাসপাতালে এখনো পর্যন্ত বাইরের কোন ঔষধ ব্যবহার করা হয় না বলে জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা। সম্পূর্ণ নিজস্ব উপায়ে প্রস্তুতকৃত আয়ুর্বেদিক ঔষধের মাধ্যমে ভর্তি হওয়া রোগীদের চিকিৎসা করা হয় এ হাসপাতালে।সম্প্রতি সরেজমিনে দেখা যায়, ১৬টি ছোট ছোট কক্ষের মধ্যে ৫ জন মহিলা, ৫ জন পুরুষ মানসিক রোগী রয়েছে।রাঙ্গুনিয়ার রচনা দাশ (৪৫) দীর্ঘ ২০ বছর যাবৎ এখানে চিকিৎসাধীন রয়েছেন।তার মতো দোহাজারীর রত্না চক্রবর্তী ২ বছর, পটিয়ার মিজানুর রহমান ২ মাস, হাসিনা বেগম ৬ বছর চিকিৎসাধীন রয়েছেন বলে জানিয়েছেন প্রতিষ্ঠানের কর্ণধার সুধীর সেন।এ সকল রোগীদের শিকল দিয়ে বেঁধে তাদের আটকিয়ে রাখা হয়েছে। আধুনিক বিজ্ঞানসম্মত ব্যবস্থা না থাকলেও এখানকার রোগীদের থাকা-খাওয়া, নাওয়া ইত্যাদি সুচারুরূপে সম্পন্ন করা হয় কেয়ারটেকারের মাধ্যমে।স্বাধীনতার পর থেকে এখানে প্রায় ২ সহস্রাধিক মানসিক রোগীকে সম্পূর্ণভাবে সুস্থ হওয়ার পর থেকে একজন রোগীও মারা যায়নি বলে তিনি দাবি করেন।আধুনিক বিজ্ঞানসম্মত কোন ব্যবস্থা না থাকা প্রসঙ্গে তিনি জানান, সরকারিভাবে বা কোন ব্যাংক অথবা দাতা সংস্থা থেকে তাদেরকে কখনও কোন সাহায্য দেয়া হয়নি| তাই চন্দনাইশের জোয়ারা পাগলা গারদ গড়ে তোলা হয়েছে সম্পূর্ণ নিজস্ব অর্থায়নে।চিকিৎসা সেবা এ প্রতিষ্ঠানের আওতার বাইরে চলে গেলে তখন রোগীদের ১৯৫৭ সালে প্রতিষ্ঠিত পাবনা মানসিক হাসপাতালে অথবা চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে পাঠিয়ে দেয়া হয় বলে জানান।তিনি বলেন, তাদের নিজস্ব প্রক্রিয়ায় বৃক্ষ গুল্ম, লতাপাতা ও বিভিন্ন ঔষধী দ্রব্যের সাহায্যে প্রস্তুতকৃত ঔষধ এখানকার ভর্তি হওয়া মানসিক রোগীদের চিকিৎসায় ব্যবহৃত হয়। এলোপ্যাথিক বা অন্য কোন ঔষধ তারা রোগীকে দেন না।এই সকল রোগীদের চিকিৎসা দেয়ার মাধ্যমে তাদের পরিবারের সদস্যদের সহযোগিতা করা হয়।যাদের পরিবারে এ ধরনের রোগী আছে তারাই বুঝেন কষ্ট। সম্পূর্ণ কবিরাজী পদ্ধতিতে এদেরকে চিকিৎসা দেয়া হয়ে থাকে।তার মতে প্রতিষ্ঠানে ভর্তি হওয়া রোগীদের সুস্থ হওয়ার রেকর্ড শতকরা ৮০ ভাগ। তাছাড়া প্রতিষ্ঠানটি চালু আর্থিক টানাপড়েনের কারণে ইচ্ছা থাকলেও তা করা হচ্ছে না।এ পাগলা গারদে ভর্তি করিয়ে কেউ কেউ রোগীর ভরণপোষণের খরচ চালায়, আবার অনেকে খবর পর্যন্ত নেয় না। রোগীদের ঔষধ প্রদান, খাবার বিতরণ চলে নিয়মিত।বন্ধ উম্মাদ রোগীদের দীর্ঘদিন ধরে এখানে রেখে তাদের অভিভাবকেরা খরচ চালায়। আবার কেউ কেউ মাসিক ভিত্তিতে খরচ দেয়।মানসিক আয়ুর্বেদিক ঔষধ মানসিক বিকাশগ্রস্তদের রোগ নিরাময়ে যতটুকু উপকারী, অন্যান্য ঔষধ দ্বারা সেরূপ নিরাময় সম্ভব নয় বলে তার দাবি| সরকার যদি ঔষধ প্রস্তুত করার জন্য একটি আধুনিক মেশিন এবং একটি এম্বুলেন্স দিয়ে তাদের সহায়তা করেন, তবে এ প্রতিষ্ঠানটি সারা দেশে পরিচিতি লাভ করবে বলে তিনি মত ব্যক্ত করেন।