মঙ্গলবার, ২৮ এপ্রিল ২০২৬, ০৮:১০ অপরাহ্ন

শিরোনামঃ

বেঁচে থাকার পথ, না নতুন ফাঁদ? জলবায়ু-প্রভাবিত অভিবাসনে ঢাকার বাস্তবতা

লেখক পরিচিতি:
রাকিব হোসেন খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগে পিএইচডি ফেলো এবং World Vision Bangladesh-এর প্রোগ্রাম কোয়ালিটি অ্যাসিউরেন্স (PQA) বিভাগের সিনিয়র ম্যানেজার ও বিভাগীয় প্রধান। 

জলবায়ু পরিবর্তন বর্তমান বিশ্বের অন্যতম বড় চ্যালেঞ্জ। এর প্রভাব শুধু পরিবেশেই সীমাবদ্ধ নয়; এটি মানুষের জীবন, জীবিকা, অর্থনীতি এবং সামাজিক কাঠামোর ওপর গভীর ও বহুমাত্রিক প্রভাব ফেলছে। বাংলাদেশের মতো নিম্নভূমি ও নদীনির্ভর দেশে এই প্রভাব আরও তীব্রভাবে দৃশ্যমান। ঘূর্ণিঝড়, নদীভাঙন, বন্যা, লবণাক্ততা বৃদ্ধি, খরা এবং অস্বাভাবিক আবহাওয়ার কারণে প্রতিবছর অসংখ্য মানুষ তাদের বসতভিটা হারাচ্ছেন। জীবিকা ও নিরাপত্তাহীনতার এই বাস্তবতা মানুষকে বাধ্য করছে স্থানান্তরে, যা আমরা জলবায়ু-সৃষ্ট অভিবাসন হিসেবে চিনি।
বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে এই অভিবাসনের প্রধান গন্তব্য হচ্ছে রাজধানী ঢাকা। ঢাকা ক্রমশ জলবায়ু-অভিবাসীদের অন্যতম প্রধান আশ্রয়স্থলে পরিণত হয়েছে। একসময় কয়েক লাখ মানুষের শহর আজ কয়েক কোটির জনবসতির নগরীতে রূপ নিয়েছে। প্রতিদিন বিপুলসংখ্যক মানুষ কাজের সন্ধানে এখানে আসছে, যাদের একটি বড় অংশই জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে স্থানচ্যুত।
ঢাকাকে আমরা প্রায়ই “সুযোগের শহর” বলি। কিন্তু জলবায়ু পরিবর্তনে ক্ষতিগ্রস্ত মানুষের জন্য এই শহর কোনো স্বপ্ন নয়, এটি বেঁচে থাকার শেষ আশ্রয়। আর সেই আশ্রয়ই অনেক সময় নতুন এক অনিশ্চয়তার ফাঁদে পরিণত হয়।
সম্প্রতি ওয়ার্ল্ড ভিশন বাংলাদেশ পরিচালিত একটি গবেষণায় উঠে এসেছে ঢাকায় জলবায়ু-প্রভাবিত অভিবাসীদের বাস্তব চিত্র। সেখানে দেখা যায়, অভিবাসন কোনো মুক্তির পথ নয়; বরং এটি ঝুঁকির এক রূপান্তর মাত্র। গ্রামে পরিবেশগত বিপর্যয় থেকে বাঁচতে এসে মানুষ শহরে সামাজিক, অর্থনৈতিক ও প্রাতিষ্ঠানিক ঝুঁকির মধ্যে আটকে পড়ছে। ঢাকায় এসে অধিকাংশ অভিবাসী আশ্রয় নেয় বস্তি বা অনানুষ্ঠানিক বসতিতে, কোরাইল, কামরাঙ্গীরচর, মিরপুর, মোহাম্মদপুর বা তেজগাঁওয়ের মতো এলাকায়। এসব জায়গায় বসবাসের পরিবেশ অত্যন্ত অনিরাপদ। অস্বাস্থ্যকর পানি, অপর্যাপ্ত স্যানিটেশন, অগ্নিকাণ্ডের ঝুঁকি, জলাবদ্ধতা, সব মিলিয়ে জীবনযাত্রা হয়ে ওঠে অনিশ্চিত ও ঝুঁকিপূর্ণ।
সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে শিশুরা। জন্মনিবন্ধনের অভাবে অনেক শিশু স্কুলে ভর্তি হতে পারে না, আবার যারা ভর্তি হয় তাদের অনেকেই টিকে থাকতে পারে না। ফলে শিশুশ্রম বাড়ছে, ছেলেরা ঝুঁকিপূর্ণ কাজে বা কিশোর গ্যাংয়ের প্রভাবে জড়িয়ে পড়ছে, আর মেয়েদের ক্ষেত্রে বাড়ছে বাল্যবিবাহ। এটি কোনো বিচ্ছিন্ন সমস্যা নয়, এটি একটি গভীর কাঠামোগত ব্যর্থতা। গবেষণায় আরও উঠে এসেছে পরিচয়ের সংকট। গ্রাম থেকে আসা শিশুরা শহরে “বহিরাগত” হিসেবে চিহ্নিত হয়। ভাষা ও উচ্চারণের কারণে তারা বৈষম্যের শিকার হয়, যা তাদের মানসিক চাপ বাড়ায় এবং সামাজিক বিচ্ছিন্নতা তৈরি করে।
নারীদের অবস্থান আরও জটিল। একদিকে তারা আয়মূলক কাজে যুক্ত হওয়ার সুযোগ পাচ্ছে, অন্যদিকে তারা পড়ছে শোষণ, অনিরাপদ কর্মপরিবেশ এবং সামাজিক নিয়ন্ত্রণের মধ্যে। শহর তাদের সুযোগ দেয়, কিন্তু নিরাপত্তা দেয় না। এই বাস্তবতা আমাদের একটি গুরুত্বপূর্ণ সত্য জানায়, অভিবাসন সমস্যার সমাধান নয়; এটি সমস্যার রূপান্তর। গ্রামে পরিবেশগত ঝুঁকি শহরে এসে রূপ নেয় সামাজিক ও প্রাতিষ্ঠানিক ঝুঁকিতে।
এদিকে ঢাকার অবকাঠামো ইতোমধ্যেই অতিরিক্ত চাপের মধ্যে রয়েছে। পানি সরবরাহ, পয়ঃনিষ্কাশন, স্বাস্থ্যসেবা, শিক্ষা, সবখানেই বাড়তি চাপ তৈরি হচ্ছে। অপরিকল্পিত বসতি গড়ে ওঠার ফলে জলাশয় ভরাট হচ্ছে, জলাবদ্ধতা বাড়ছে, এবং শহরের বাসযোগ্যতা ক্রমেই কমছে। তবুও আমাদের নীতিনির্ধারণে এই বাস্তবতা যথাযথভাবে প্রতিফলিত হচ্ছে না। ডেল্টা প্ল্যান ২১০০ বা জাতীয় অভিযোজন পরিকল্পনার মতো গুরুত্বপূর্ণ নীতিতে অভ্যন্তরীণ অভিবাসন এখনো কেন্দ্রীয়ভাবে বিবেচিত নয়। শহর পরিকল্পনাও ধরে নেয় জনসংখ্যা স্থির—যা বাস্তবতার সঙ্গে অসামঞ্জস্যপূর্ণ।
ফলে অভিবাসীরা থেকে যাচ্ছে নীতির বাইরে, সেবা পাচ্ছে না, অধিকার পাচ্ছে না, এবং ধীরে ধীরে একটি অদৃশ্য জনগোষ্ঠীতে পরিণত হচ্ছে। এই অবস্থার পরিবর্তন জরুরি। জন্মনিবন্ধন প্রক্রিয়াকে এমনভাবে সহজ করতে হবে, যাতে অভিবাসী পরিবারগুলোও কোনো জটিলতা ছাড়াই তাদের সন্তানদের নিবন্ধন সম্পন্ন করতে পারে; নতুবা শিশুরা স্থায়ীভাবে শিক্ষা ও সেবার বাইরে থেকে যাবে। একই সঙ্গে শহর পরিকল্পনায় অভিবাসীদের বাস্তবতা অন্তর্ভুক্ত করা অপরিহার্য, শিক্ষা, স্বাস্থ্য ও বাসস্থানের ক্ষেত্রে তাদের জন্য কার্যকর ও বাস্তবসম্মত বরাদ্দ নিশ্চিত করতে হবে। বস্তি এলাকাগুলোতে শিশুদের জন্য নিরাপদ পরিবেশ তৈরি করা, বিকল্প শিক্ষা সুযোগ এবং সুরক্ষা কার্যক্রম জোরদার করাও সময়ের দাবি। পাশাপাশি দক্ষতা উন্নয়ন ও কর্মসংস্থানের সুযোগ বিস্তৃত করতে হবে, যাতে পরিবারগুলো কেবল টিকে থাকার লড়াইয়ে সীমাবদ্ধ না থেকে ধীরে ধীরে উন্নতির পথে এগোতে পারে।
একই সঙ্গে গ্রামীণ এলাকাগুলোতে টেকসই উন্নয়ন নিশ্চিত করা জরুরি। উপকূলীয় ও নদীভাঙনপ্রবণ অঞ্চলে যদি মানুষ নিরাপদ জীবন ও জীবিকার সুযোগ পায়, তাহলে শহরমুখী অভিবাসনের চাপ অনেকটাই কমানো সম্ভব হবে। জলবায়ু সহনশীল কৃষি, বিকল্প কর্মসংস্থান এবং দুর্যোগ মোকাবিলার সক্ষমতা বৃদ্ধি এই ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো—আমাদের স্বীকার করতে হবে, জলবায়ু অভিবাসন কোনো ভবিষ্যতের সংকট নয়; এটি ইতোমধ্যেই বর্তমান বাস্তবতা।


আপনার মতামত লিখুন :

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *