মঙ্গলবার, ১৪ জুলাই ২০২৬, ০৮:৪০ পূর্বাহ্ন

শিরোনামঃ
২৯ আষাঢ়ে তাঁর আগমন—স্বপ্ন ও সম্ভাবনার এক নতুন আলো! সড়কের বেহাল দশা, টিউবওয়েল ও সড়ক বাতি নেই মায়ের জন্য দোয়া চেয়েছেন – ফরিদউদ্দিন মানিক গাছ পড়ে ৩ ঘর বিধ্বস্ত-বিদ্যুৎ বিভাগের প্রায় ২৫ লক্ষ টাকার ক্ষয়ক্ষতি। চট্টগ্রাম চন্দনাইশে মোবাইল কোর্টের অভিযানে অননুমোদিত বীজ বিক্রয়ের অপরাধে ৩০,০০০/- টাকা জরিমানা শরণখোলায় ডিএনসির অভিযান: ৫০ পিস ইয়াবাসহ সরঞ্জাম উদ্ধার, ছাদ থেকে লাফিয়ে পালালেন শীর্ষ কারবারি ভোগান্তিতে পৌরবাসী চন্দনাইশ পৌরসভার অধিকাংশ সড়ক সংস্কারবিহীন অবস্থায় দোহাজারী পৌরসভার হাফছড়ি খালের ওপর কাঠের সেতুর উদ্বোধন চট্টগ্রাম দোহাজারীতে বিষাক্ত উপাদান দিয়ে আইসক্রিম তৈরির অপরাধে ২০ হাজার টাকা জরিমানা সহ মালামাল জব্দ। শরণখোলায় সোনালী ব্যাংকের গ্রাহকের অ্যাকাউন্ট হ্যাক

২৯ আষাঢ়ে তাঁর আগমন—স্বপ্ন ও সম্ভাবনার এক নতুন আলো!

২৯ আষাঢ়ে তাঁর আগমন—স্বপ্ন ও সম্ভাবনার এক নতুন আলো!

সম্পাদকীয় 

আজ ১৩ জুলাই ২০২৬, বাংলা পঞ্জিকার ২৯ আষাঢ়। ঐকান্তিক সেই মানুষটির জীবনের ৫১তম জন্মদিন। জন্মদিন মানেই সকলের কাছে শুধু বয়সের আরেকটি সংখ্যা নয়; এটি ফিরে তাঁকানোর দিন, কৃতজ্ঞ হওয়ার দিন, নিজেকে নতুন করে আবিষ্কারের দিন।
আজ থেকে ঠিক একান্ন বছর আগে, এমনই এক রবিবারের ঝড়-বৃষ্টিভেজা সন্ধ্যায় তাঁর জন্ম। বাইরে তখন প্রকৃতির উন্মত্ত রূপ—আকাশজুড়ে কালো মেঘ, অবিরাম বর্ষণ, ঝড়ো বাতাস আর বজ্রপাতের গর্জন। আজ মনে হয়, প্রকৃতির সেই উত্তাল সন্ধ্যা যেন তাঁর জীবনযাত্রারই এক নীরব পূর্বাভাস ছিল। কারণ তাঁর পথচলাও ছিল ঝড়, সংগ্রাম, প্রতিকূলতা এবং অদম্য প্রত্যয়ের এক দীর্ঘ অভিযাত্রা।
তাঁর শৈশব কেটেছে কোনো এক অজপাড়া গাঁয়ের নানাবাড়িতে। সীমিত সম্পদ আর সীমাহীন দূর্ভোগকে সাথে নিয়ে পাড়ি দেয়া সেই সাধারণ পরিবার। আপাত: দৃষ্টিতে মনে হয়, নানার অভাবের সংসারে তাঁর জন্ম যেন আরও একটি অভাবের নতুন মাত্রা যোগ করেছিল। মা-বাবার স্নেহ-ছায়া ছাড়া বেড়ে ওঠা কোনো শিশুর জন্যই সহজ নয়। ঠিক তেমনি তাঁর জীবনের পথটিও অত সহজ ছিলনা।
অভাব ছিল তাঁর দৈনন্দিন সঙ্গী। পরনের কাপড়ের অভাব ছিল, পড়াশোনার প্রয়োজনীয় বই কেনার সামর্থ্য ছিল না, অনেক সময় পায়ে জুতা ছিল না, এমনকি তিনবেলা পেট ভরে খাওয়াও ছিল প্রায় অনিশ্চিত! তবুও আজ পিছনে ফিরে তাকালে তিনি মনে করেন, তিনি আসলে অনেক কিছুই পেয়েছিলেন। পেয়েছিলেন আশ্রয়, পেয়েছিলেন মানুষের মমতা, আর পেয়েছিলেন এক অনন্য শৈশবের নৈসর্গিক প্রকৃতি।
গ্রাম তাঁকে শিখিয়েছে জীবনকে কত ভাবে ভালোবাসা যায়! সবুজ ধানের মাঠ, বিস্তীর্ণ বনভূমি, আম-কাঁঠালের বাগান, বেতঝাড়, আঁকাবাঁকা মেঠোপথ, বর্ষার জল, শরতের আকাশ, হেমন্তের ধান, শীতের কুয়াশা, বসন্তের রঙ—বাংলার ছয় ঋতু, ইত্যাদি ছিল তাঁর প্রথম বিশ্ববিদ্যালয়। প্রকৃতিই ছিল তাঁর প্রথম শিক্ষক। সেই প্রকৃতির বুকেই তিনি শিখেছেন ধৈর্য, সৌন্দর্য, সহনশীলতা এবং জীবনের গভীরতম পাঠ।
দারিদ্র্য তাঁকে খুব অল্প বয়সেই কঠিন বাস্তবতার মুখোমুখি দাঁড় করিয়ে দেয়। সপ্তম শ্রেণিতে পড়াকালেই দিনমজুরের কাজ শুরু করেন তিনি। সেই শ্রমজীবনের পথ বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষাজীবন পর্যন্ত অব্যাহত ছিল। দিনের পর দিন কঠোর পরিশ্রম করেছেন, আবার একই সাথে বইও হাতে তুলে নিয়েছেন। অনেক সময় মনে হয়েছে, জীবন যেন একই সঙ্গে দুটি যুদ্ধ লড়তে বলেছে—একটি বেঁচে থাকার, আরেকটি স্বপ্ন বাঁচিয়ে রাখার।
তবে এই দীর্ঘ সংগ্রামের পথে তিনি কখনো পুরোপুরি একা ছিলেন না। জীবনের নানা সময়ে অনেক মহান হৃদয়ের মানুষ তাঁর পাশে দাঁড়িয়েছেন। তাঁদের অশেষ ঋণ তিনি কোনো দিন শোধ করতে পারবেনন না।
তাঁর সাথে ছিলেন প্রিয় নানি। তিনি ছিলেন তাঁর জীবনের সবচেয়ে বড় আশাবাদী মানুষ। সীমাহীন দারিদ্র্যের মধ্যেও তিনি অবিচল বিশ্বাস নিয়ে বলতেন, “তুই একদিন বড় মানুষ হবি, উচ্চশিক্ষা অর্জন করবি।” তাঁর এই কথাগুলো শুধু আশীর্বাদ ছিল না; ছিল তাঁর জীবনের চালিকাশক্তি। বড় মানুষ হওয়ার অর্থ যে কেবল পদ বা সম্পদ নয়, বরং জ্ঞান, সততা, মানবিকতা ও মানুষের কল্যাণে নিজেকে উৎসর্গ করা—এই উপলব্ধিও তাঁর কাছ থেকেই পাওয়া।
আজও তিনি ভাবেন, চারপাশের সীমাহীন অভাবের মধ্যেও তিনি কীভাবে তাঁর প্রতি এত গভীর আস্থা রেখেছিলেন! হয়তো তিনি তাঁর ভেতরের সম্ভাবনাকে দেখতে পেয়েছিলেন। হয়তো তিনি বুঝেছিলেন, শেখার প্রতি তাঁর অদম্য আগ্রহ আর স্বপ্ন দেখার সাহস একদিন তাঁকে অনেক দূর নিয়ে যাবে।
সর্বশক্তিমান সৃষ্টিকর্তার অসীম কৃপায় আজ তিনি তিনটি মাস্টার্স ডিগ্রি সম্পন্ন করেছেন এবং অস্ট্রেলিয়ার মেলবোর্নের ডিকিন বিশ্ববিদ্যালয়ে উচ্চশিক্ষা গ্রহণের সৌভাগ্য অর্জন করেছেন। এই অর্জনগুলো তাঁর ব্যক্তিগত গৌরবের চেয়ে অনেক বেশি—এগুলো প্রমাণ করে, প্রতিকূলতা কখনো মানুষের ভাগ্য নির্ধারণ করে না; বরং মানুষের অধ্যবসায়ই তার ভবিষ্যৎ নির্মাণ করে।
জীবন তাঁকে অসংখ্য শিক্ষা দিয়েছে। দারিদ্র্য ছিল তাঁর শ্রেষ্ঠ শিক্ষক। ভালো মানুষরা তাঁকে দিয়েছেন ভালোবাসা, অনুপ্রেরণা ও সাহস। আর কঠিন মানুষগুলো তাঁকে দিয়েছেন বাস্তবতার শিক্ষা, ধৈর্য ও অভিজ্ঞতা। আজ তিনি বুঝেন, জীবনে চলার পথের প্রতিটি মানুষই কোনো না কোনোভাবে আমাদের শিক্ষক।
তিনি আজও নিজেকে একজন ক্ষুধার্ত পাঠক মনে করেন—জ্ঞানপিপাসু এক শিক্ষার্থী, যে এখনো শেখা শেষ করতে পারেনি। তিনি একজন অবিচল পথিকও। তাঁর কাছে প্রতিটি মানুষ একটি খোলা বই। মানুষের আনন্দ, বেদনা, প্রেম, ভালোবাসা, বিচ্ছেদ, সংগ্রাম এবং স্বপ্নের গল্প তাঁকে প্রতিনিয়ত সমৃদ্ধ করে। বই, মানুষ এবং ভ্রমণ—এই তিনটি তাঁর জীবনের সবচেয়ে বড় বিশ্ববিদ্যালয়। এগুলো তাঁকে জ্ঞান দিয়েছে, প্রজ্ঞা দিয়েছে এবং পৃথিবীকে নতুন চোখে দেখতে শিখিয়েছে।
আজ তিনি একটি আন্তর্জাতিক সংস্থায় জ্যেষ্ঠ নেতৃত্বের দায়িত্ব পালন করছেন। কিন্তু তাঁর জীবনের সবচেয়ে বড় আশীর্বাদ কোনো পদ বা পরিচয় নয়। সবচেয়ে বড় আশীর্বাদ হলো, সৃষ্টিকর্তা তাঁকে সেইসব অসহায়, সুবিধাবঞ্চিত ও ঝুঁকিপূর্ণ শিশুদের জন্য কাজ করার সুযোগ দিয়েছেন, যাদের জীবনের কষ্ট তিনি নিজেই অনুভব করেছেন। তাঁদের মুখে হাসি ফোঁটানোর ছোট্ট প্রয়াসেই তিনি তাঁর জীবনের প্রকৃত অর্থ খুঁজে পান। তাঁদের সেবা করাই তাঁর কাছে পেশা নয়, বরং একটি দায়িত্ব, একটি মানবিক অঙ্গীকার।
আজ তাঁর ৫১তম জন্মদিনে তিনি গভীর কৃতজ্ঞতায় মাথা নত করছেন সর্বশক্তিমান সৃষ্টিকর্তার কাছে। কৃতজ্ঞতা জানান তাঁর স্বর্গীয় নানির প্রতি, যাঁর বিশ্বাস তাঁকে আজও পথ দেখায়। তিনি কৃতজ্ঞতা জানান তাঁর হাতেগোনা কয়েকজন সত্যিকারের বন্ধুর প্রতি, জীবনের পথে পাওয়া অসংখ্য শুভাকাঙ্ক্ষীর প্রতি এবং সেই প্রতিটি সংগ্রামের প্রতি, যা তাঁকে আজকের মানুষটি হতে সাহায্য করেছে। কারণ আজ তিনি বিশ্বাস করেন—জীবনের প্রতিটি কষ্ট আমাদের ভেঙে দেওয়ার জন্য আসে না; অনেক কষ্টই আসে আমাদের নতুন করে গড়ে তোলার জন্য।
তাঁর প্রার্থনা, মহান সৃষ্টিকর্তা তাঁকে এবং তাঁর পরিবারকে সুস্থ, শান্তিময়, আনন্দময় ও অর্থবহ জীবন দান করুন। তিনি যেন তাঁর ইচ্ছাকে তাঁর চিন্তা, কর্ম এবং সেবার মাধ্যমে বাস্তবায়িত করে যেতে তাঁকে শক্তি ও প্রজ্ঞা দেন।
ঝড়ের সেই সন্ধ্যায় জন্ম নেওয়া একটি দরিদ্র গ্রামের ছেলের গল্প এখনো শেষ হয়নি। এটি এখনো এগিয়ে চলেছে—কৃতজ্ঞতা, বিশ্বাস, মানবিকতা, শিক্ষা এবং মানুষের সেবার এক অনন্ত যাত্রাপথে।
জন্মদিনে তাঁর জন্য সবার আন্তরিক দোয়া, আশীর্বাদ ও শুভকামনা প্রার্থনা করছি। তাঁর জীবনের আগামী দিনগুলো যেন মানুষের কল্যাণে আরও বেশি অর্থবহ হয়ে ওঠে—এই কামনাই আজকের সবচেয়ে বড় প্রাপ্তি।
আজ ২৯ আষাঢ়—এই দিনে জন্মগ্রহণ করেছিলেন সেই কাঙ্খিত মানুষটি- মি: সাগর মারান্ডী।
ব্যক্তিগত জীবনে তিনি শুধু নিজের পরিবারের প্রতিই নন, বরং সমাজ ও রাষ্ট্রের পিছিয়ে পড়া প্রান্তিক মানুষের, বিশেষ করে শিশুদের কল্যাণে নিবেদিত এক মানবিক ব্যক্তিত্ব। সময়-অসময়, প্রয়োজনের মুহূর্তে তিনি ছুটে যান মানুষের পাশে। সাহস, নিষ্ঠা ও মানবিকতায় সহকর্মীদের অনুপ্রাণিত করে চলেছেন নিরলসভাবে।
এমন একজন মানবিক মানুষ সাগর মারান্ডীর জন্মদিনে সকলের পক্ষ থেকে জানাই আন্তরিক শুভেচ্ছা, গভীর শ্রদ্ধা এবং অফুরন্ত শুভকামনা। তিনি সুস্থ, সুন্দর ও দীর্ঘায়ু জীবন লাভ করুন, আর তাঁর মানবকল্যাণের এই পথচলা আরও সমৃদ্ধ হোক—এই প্রার্থনাই রইল।


আপনার মতামত লিখুন :

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *