সোমবার, ১৭ অগাস্ট ২০২৬, ০৯:৩৪ পূর্বাহ্ন
ইমারত পরিদর্শক ও অথরাইজড অফিসারের তদারকির অভাবে ৫ তলা পর্যন্ত নির্মাণ কাজ সম্পন্ন
নার্গিস রুবি:
রাজধানীর পল্লবী দুয়ারিপাড়ায় রাজউকের অনুমোদিত নকশা অমান্য করে নয়তলা ভবনের ৫ তলা পর্যন্ত নির্মাণের অভিযোগ উঠেছে। রাজউক জোনাল অফিস ৩/১ এর আওতাধীন প্লট নং–১৪ ও ১৬, রোড–৪, ব্লক–খ, সেকশন–৮–এ মো: গোলাম কিবরিয়া ও নাসিমা সুলতানার মালিকানাধীন ভবনটিতে নয়তলা অনুমোদনের বিপরীতে পাঁচ তলা পর্যন্ত ছাদ ঢালাইয়ের কাজ চলছে, এবং নির্মাণকাজে একাধিক পর্যায়ে গুরুতর নকশা লঙ্ঘনের প্রমাণ মিলেছে।
নকশা লঙ্ঘন ও অনুমোদনবহির্ভূত সম্প্রসারণ:
স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, ইমারত পরিদর্শক ও অথরাইজড অফিসারের তদারকির অভাবে ভবনের চারদিকে সেটব্যাক লঙ্ঘন, অনুমোদনবহির্ভূত বারান্দা সম্প্রসারণ, এবং প্রক্ষেপিত অংশে উল্লেখযোগ্য ডেভিয়েশন করে ৫ তলা পর্যন্ত ভবন নির্মাণ করেছেন ভবন মালিক। নকশা পরিবর্তনের কারনে ভবনের কাঠামোগত স্থিতিশীলতার ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে।
নির্মাণ শ্রমিকদের অবহিত সূত্রে জানা যায়, অতিরিক্ত বর্ধিত অংশের কারণে ভবনের লোডিং পয়েন্ট নকশা অনুযায়ী ধরে রাখা সম্ভব হচ্ছে না, যা ভবিষ্যতে মারাত্মক ঝুঁকি তৈরি করতে পারে।
একজন কাঠামো বিশেষজ্ঞ জানান—
“অনুমোদনবহির্ভূত সম্প্রসারণ ভবনের কেন্দ্রীয় ভারসাম্যে বড় ধরনের বিচ্যুতি ঘটায়। ঢাকার মতো ভূমিকম্পপ্রবণ অঞ্চলে ছোট ভুলও বড় দুর্যোগ ডেকে আনতে পারে।”
নিরাপত্তাহীন নির্মাণকাজ—শ্রমিক ও পথচারী ঝুঁকিতে:
নির্মাণসাইটে শ্রমিকদের জন্য সেফটি নেট, সেফটি গার্ড, কিংবা ব্যক্তিগত সুরক্ষা সরঞ্জাম (PPE)–এর কোনো ব্যবহার দেখা যায়নি।
স্থানীয়রা অভিযোগ করে বলেন, ভবনের পাশের রাস্তায় প্রতিনিয়ত ইট, রড ও নির্মাণসামগ্রী ওপর থেকে পড়ার শঙ্কা থাকে। শ্রমিকরাও কাজ করছেন সম্পূর্ণ নিরাপত্তাহীন পরিবেশে।
বাংলাদেশ শ্রম আইন, ২০০৬ (সংশোধিত ২০১৮)–এ শ্রমিকদের সুরক্ষা নিশ্চিত না করে কোনো নির্মাণ কাজ করা আইনগতভাবে দণ্ডনীয় অপরাধ, কিন্তু ভবনটিতে আইনটির প্রকাশ্য লঙ্ঘন হচ্ছে বলে অভিযোগ।
নগর পরিকল্পনাবিদরা বলছেন,
একজন নগর পরিকল্পনাবিদ মন্তব্য করেন—
“রাজউকের অনুমোদন না মেনে ভবন নির্মাণ করা শুধু আইনগত অপরাধই নয়, এটি পুরো এলাকার বাসিন্দাদের জীবনের ওপর ঝুঁকি তৈরি করে। এটি দীর্ঘদিনের দুর্বল তদারকি এবং প্রশাসনিক শৈথিল্যের প্রতিচ্ছবি।”
স্থানীয়দের ক্ষোভ ও দাবি:
দুয়ারিপাড়া এলাকাবাসীরা জানান, রাতদিন নির্মাণকাজের শব্দদূষণ, ইট–বালু–সিমেন্টের ধুলোবালিতে পরিবেশ দূষিত হচ্ছে। পাশাপাশি অনুমোদনবহির্ভূত তল্লাট নির্মাণের কারণে ভবনটির অবস্থান আশপাশের বাড়িগুলোর ওপর চাপ সৃষ্টি করছে।
একজন ক্ষুব্ধ বাসিন্দা বলেন—
“এটি শুধু একটি ভবনের অনিয়ম নয়, এটি নগর ব্যবস্থাপনার ব্যর্থতা এবং প্রাতিষ্ঠানিক দুর্নীতির স্পষ্ট প্রতিচ্ছবি।”
তারা দ্রুত নির্মাণকাজ বন্ধ, স্বাধীন তদন্ত, এবং দায়ীদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণের দাবি জানান।
রাজউকের অবস্থান:
রাজউকের অথরাইজড অফিসার এফ আর আশিক আহমেদ এবং ইমারত পরিদর্শক শফিকুল ইসলাম জানান—
“ভবন মালিককে নোটিশ দেওয়া হয়েছে। খুব শিগগিরই প্রয়োজনীয় আইনগত ব্যবস্থা ও উচ্ছেদ অভিযান পরিচালনা করা হবে।”
এই রিপোর্ট লেখা পর্যন্ত ভবন মালিকের কোনো বক্তব্য পাওয়া যায়নি।
আইনগত পর্যালোচনা:
ইমারত নির্মাণ আইন, ১৯৫২ অনুযায়ী, অনুমোদনবিহীন নির্মাণ দণ্ডনীয়।
বিল্ডিং কনস্ট্রাকশন রুলস, ২০০৮–এ নকশা deviation গুরুতর অপরাধ হিসেবে বিবেচিত।
রাজউকের নিয়ম অনুযায়ী, নকশা অনুসরন না করে বা অনুমোদিত নকশা অনুয়ায়ী ভবন নির্মাণ না করা সম্পূর্ণ বেআইনি।
শ্রম আইনে শ্রমিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করা বাধ্যতামূলক।
আইন বিশেষজ্ঞরা বলছেন, নকশা লঙ্ঘন ও অনুমোদনবহির্ভূত নির্মাণের কারণে ভবন নির্মাণ তাৎক্ষণিকভাবে বন্ধ ও মালিকের বিরুদ্ধে ফৌজদারি আইনে মামলা দায়ের করা যেতে পারে।
দ্রুত নগরায়ন ও নিয়ন্ত্রণ সংকট:
নগর বিশেষজ্ঞদের মতে, রাজধানীতে দ্রুত নগরায়নের চাপ এবং দুর্বল নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা মিলিয়ে নীরবে গড়ে উঠছে অসংখ্য অনিয়মিত ভবন। তারা আশঙ্কা প্রকাশ করে বলেন—
“এভাবে অনিয়ম চলতে থাকলে এসব অবৈধ ভবনই একসময় ঢাকা শহরের ‘নীরব বিপর্যয়’ হয়ে দাঁড়াবে।”