রবিবার, ২৬ এপ্রিল ২০২৬, ০৯:৪৫ অপরাহ্ন

শিরোনামঃ
রাবিতে উদ্বৃত্ত টাকা ফেরত দিলো ভিপি রাজধানীর মিরপুর-১১ তে নিয়মবহির্ভূতভাবে ৬ তলা ভবন নির্মাণ, রাজউকের রহস্যজনক নিরবতা ….. ……….  একটি শোক সংবাদঃ.,..,………….  জেলা ছাত্রদলের নেতা শাহরিয়ার নিয়াজের উদ্যোগে ফ্রি চিকিৎসা সেবা রাজশাহীতে ব্ল্যাক মেইল করে বিয়ে দোহাজারী নাগরিক কমিটির অভিষেক অনুষ্ঠানে জসিম উদ্দীন আহমেদ এমপি আব্দুল আজিজ মাধ্যমিক বিদ্যালয়ে বিদায় ও দোয়া অনুষ্ঠান অনুষ্ঠিত চকরিয়ার জীবন বলি চ্যাম্পিয়ন চন্দনাইশ বরকলে শতবর্ষের বিশ্ব পুকুরের বলি খেলায় কানায় কানায় পরিপূর্ণ মাঠ নারী সাংবাদিককে হেনস্তার আলোচিত ঘটনায় রাজউকের ইমারত পরিদর্শক গ্রেপ্তার। দোহাজারীতে ব্রিটিশ আমলে নির্মিত সড়ক বেদখল হতে হতে আইলে রুপান্তরিত, পুনরুদ্ধার করলেন এসিল্যান্ড ঝন্টু বিকাশ চাকমা

রাজধানীর মিরপুর-১১ তে নিয়মবহির্ভূতভাবে ৬ তলা ভবন নির্মাণ, রাজউকের রহস্যজনক নিরবতা

যাদের ওপর আইনগত ব্যবস্থা গ্রহনের দায়িত্ব বর্তায় তারাই ঝুঁকিপূর্ন ভবন নির্মাণের সুযোগ করে দিয়েছে।

স্টাফ রিপোর্টার : রাজধানীর মিরপুরের সেকশন-১১, ব্লক-বি, লেন-৭, রোড-১২-এ অবস্থিত বাড়ি নং-৮-এর ছয়তলা ভবনটি যেভাবে নির্মিত হয়েছে, তা বাংলাদেশের ভবন নির্মাণ সংক্রান্ত আইন ও বিধিমালার একেবারে বিপরীতে দাঁড়িয়ে আছে। ভবন মালিক এক ইঞ্চি জায়গাও না ছেড়ে নিয়ম-নীতির তোয়াক্কা না করে এই ভবনটি নির্মাণ করেছেন, যেখানে নির্মাণকারী প্রতিষ্ঠান হিসেবে কাজ করেছে এ্যালায়েন্স বিল্ডার্স লিমিটেড এবং ইমারত পরিদর্শক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন ফয়েজ।

এমনকি ভবনে লোকজন উঠে বসবাস করছে, অথচ এর কোনো অকুপেন্সি সার্টিফিকেট নেই। ছয়তলা পর্যন্ত নিয়মবহির্ভূতভাবে ভবনটি নির্মিত হলেও রাজউক এখন পর্যন্ত কোনো আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণ করেনি, যা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।

বাংলাদেশে ভবন নির্মাণ নিয়ন্ত্রণের প্রধান আইন হলো ইমারত নির্মাণ আইন, ১৯৫২ (Building Construction Act, 1952)। এই আইনের ৩ ধারায় স্পষ্টভাবে বলা হয়েছে যে, সংশ্লিষ্ট এলাকার অনুমোদিত কর্মকর্তার পূর্বানুমতি ব্যতীত কোনো ভবন নির্মাণ বা পুনর্নির্মাণ করা যাবে না। এই ধারায় একটি নন-অবস্ট্যান্ট ক্লজ রয়েছে, যার মানে হলো অন্য যেকোনো আইন থাকা সত্ত্বেও এই বিধানটি প্রযোজ্য হবে। অর্থাৎ, রাজউকের অনুমোদন ছাড়া এই ভবনের নির্মাণকাজ শুরু করা আইনত দণ্ডনীয় অপরাধ।

একই আইনের ৩বি ধারা অনুযায়ী, যদি অনুমোদন ছাড়া বা অনুমোদনের শর্ত ভঙ্গ করে কোনো ভবন নির্মাণ করা হয়, তবে অনুমোদিত কর্মকর্তা বা কমিটি সাত দিনের নোটিশ দিয়ে মালিক, দখলদার ও দায়িত্বপ্রাপ্ত ব্যক্তিকে কারণ দর্শানোর সুযোগ দেবেন। যদি কেউ নোটিশের জবাব দিতে ব্যর্থ হন বা জবাব সন্তোষজনক না হয়, তবে অনুমোদিত কর্মকর্তা ভবনটি অপসারণ বা ভেঙে ফেলার নির্দেশ দিতে পারেন।

তবে আইনটি আরও বলে, যদি ভবনটি মাস্টার প্ল্যানের পরিপন্থী না হয় এবং পুনর্নির্মাণযোগ্য হয়, তবে মালিককে পাঁচ হাজার থেকে পঞ্চাশ হাজার টাকা পর্যন্ত জরিমানা এবং নির্ধারিত ফির দশগুণ ফি পরিশোধ করে নতুন করে অনুমোদন নেওয়ার সুযোগ দেওয়া যেতে পারে। কিন্তু এই ক্ষেত্রে ভবনটি এক ইঞ্চি জায়গাও না ছেড়ে নির্মিত হওয়ায় এবং ছয়তলা পর্যন্ত নির্মিত হওয়ায় এটি স্পষ্টতই মাস্টার প্ল্যান ও নির্মাণ বিধিমালার গুরুতর লঙ্ঘন, ফলে এর পুনর্নির্মাণ বা নিয়মিতকরণের সুযোগ নেই বললেই চলে।

এছাড়া, বাংলাদেশ ন্যাশনাল বিল্ডিং কোড (বিএনবিসি) ২০২০-এর দ্বিতীয় খণ্ডের তৃতীয় অধ্যায়ে ভবন নির্মাণের জন্য চার ধাপের পারমিট নির্ধারণ করা হয়েছে, যার মধ্যে শেষ ধাপটি হলো অকুপেন্সি সার্টিফিকেট বা ভবন দখলের অনুমতিপত্র। এই কোড অনুযায়ী, কোনো ভবন নির্মাণ সম্পূর্ণ হওয়ার পর ভবনটি অনুমোদিত পরিকল্পনা ও বিএনবিসির বিধান অনুযায়ী নির্মিত হয়েছে কিনা তা পরীক্ষা করে অকুপেন্সি সার্টিফিকেট ইস্যু করতে হবে, এবং এই সার্টিফিকেট ছাড়া কোনো ভবনে বসবাস বা ব্যবহার করা যাবে না। কিন্তু মিরপুরের এই ভবনে লোকজন উঠে বসবাস করছে, অথচ এর কোনো অকুপেন্সি সার্টিফিকেট নেই, যা বিএনবিসির সুস্পষ্ট লঙ্ঘন।

বিএনবিসি ২০২০-এর তৃতীয় খণ্ডের দ্বিতীয় অধ্যায়ে বলা হয়েছে, প্রত্যেক ভবনের জন্য ন্যূনতম পেছনের ও পাশের খোলা জায়গা নির্ধারণ করা আছে, যা ভবনের উচ্চতা ও ধরন অনুযায়ী ভিন্ন হয়। এক ইঞ্চি জায়গাও না ছেড়ে ভবন নির্মাণ করা মানে এই ন্যূনতম খোলা জায়গার বিধান ভঙ্গ করা, যা আগুন লাগা বা ভূমিকম্পের সময় ভবন ধসে পড়ার ঝুঁকি বাড়িয়ে দেয়।

এই ভবনের ক্ষেত্রে একাধিক পক্ষের দায় ও অপরাধ স্পষ্টভাবে চিহ্নিত করা যায়। প্রথমত, ভবন মালিকের দায় সর্বাধিক। তিনি রাজউকের অনুমোদন ছাড়াই ভবন নির্মাণ করেছেন, যা ইমারত নির্মাণ আইন, ১৯৫২-এর ৩ ধারার সুস্পষ্ট লঙ্ঘন। তিনি বিএনবিসির ন্যূনতম খোলা জায়গার বিধান মেনে চলেননি, ফলে ভবনটি অগ্নি ও ভূমিকম্প ঝুঁকিতে রয়েছে।

অকুপেন্সি সার্টিফিকেট ছাড়াই লোকজনকে ভবনে উঠতে দেওয়ায় তিনি বসবাসকারীদের জীবন বিপন্ন করছেন, যা অবহেলাজনিত হত্যার অপরাধের আওতায় আসতে পারে। দ্বিতীয়ত, নির্মাণকারী প্রতিষ্ঠান এ্যালায়েন্স বিল্ডার্স লিমিটেডের দায় রয়েছে। একটি নির্মাণ প্রতিষ্ঠান হিসেবে তাদের দায়িত্ব ছিল রাজউকের অনুমোদন ও বিএনবিসির বিধান অনুযায়ী ভবন নির্মাণ করা। অনুমোদন ছাড়া এবং নিয়ম-নীতির তোয়াক্কা না করে ভবন নির্মাণ করায় তারাও ইমারত নির্মাণ আইনের অপরাধী। ইমারত নির্মাণ আইনের ১২ ধারার ১এ উপধারায় বলা হয়েছে, যে কেউ বিএনবিসির বিধান ভঙ্গ করে ভবন নির্মাণ পরিকল্পনা প্রণয়ন, অনুমোদন বা বাস্তবায়ন করলে বা বিএনবিসির বিধান ভঙ্গ করে ভবন নির্মাণ করলে, তাকে সর্বোচ্চ সাত বছরের কারাদণ্ড বা অন্যূন পঞ্চাশ হাজার টাকা জরিমানা বা উভয় দণ্ডে দণ্ডিত করা যেতে পারে।

তৃতীয়ত, ইমারত পরিদর্শক ফয়েজের দায় রয়েছে। পরিদর্শক হিসেবে তার দায়িত্ব ছিল নির্মাণকাজ পর্যবেক্ষণ করা এবং কোনো অনিয়ম দেখলে তা রোধ করা বা রাজউককে অবহিত করা। কিন্তু তিনি নিয়মবহির্ভূত নির্মাণকাজ চোখ বন্ধ করে দেখেছেন বা দেখার ভান করেছেন, যা তার পেশাগত দায়িত্বের গুরুতর অবহেলা।

চতুর্থত এবং সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণভাবে, রাজউকের দায় ও অবহেলা এই ঘটনায় অবিচ্ছেদ্য অংশ। রাজউকের ইমারত পরিদর্শকরা সংশ্লিষ্ট এলাকার সব ভবনের ওপর নজরদারির দায়িত্বপ্রাপ্ত। যদি তারা কোনো অনিয়ম বা পার্থক্য দেখতে পান বা কোনো প্রতিবেশী অভিযোগ করেন, তবে তারা দুইসি ধরনের নোটিশ জারি করেন এবং ভঙ্গকারীকে নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে অনুমোদনের কাগজপত্র দেখানোর নির্দেশ দেন। এই নোটিশ তিনবার পাঠানো হয়, এবং মালিক যদি প্রয়োজনীয় দলিল প্রদর্শন করতে ব্যর্থ হন, তবে রাজউক ভবনটি ভেঙে ফেলার ক্ষমতা রাখে। কিন্তু মিরপুরের এই ভবনের ক্ষেত্রে রাজউক কোনো পদক্ষেপ নেয়নি, যা তাদের পক্ষ থেকে দায়িত্বে অবহেলার সুস্পষ্ট প্রমাণ।

সম্প্রতি রাজউকের নতুন খসড়া অধ্যাদেশ ২০২৫-এ মাস্টার প্ল্যান লঙ্ঘনের জন্য সর্বোচ্চ দুই বছরের কারাদণ্ড বা দশ কোটি টাকা জরিমানা বা উভয় দণ্ডের বিধান রাখা হয়েছে।

খোলা জায়গায় দশ ফুটের বেশি নির্মাণ করলে পঞ্চাশ লাখ টাকা জরিমানা এবং রাস্তা দখল করে নির্মাণ করলে পচাত্তর লাখ টাকা জরিমানা বা ছয় মাসের কারাদণ্ডের বিধান রাখা হয়েছে। যদিও এই অধ্যাদেশ এখনও চূড়ান্তভাবে আইনে পরিণত হয়নি, তবে বর্তমান আইনেও রাজউকের ক্ষমতা ও দায়িত্ব স্পষ্ট।

রাজউকের দায়িত্বহীনতার কারণে ঢাকায় অবৈধ ভবনের সংখ্যা আকাশচুম্বী। এক জরিপে দেখা গেছে, ২০০৬ থেকে ২০১৬ সাল পর্যন্ত রাজউকের এলাকায় প্রতি বছর গড়ে ৯৫ হাজার নতুন স্থাপনা নির্মিত হয়েছে, অথচ রাজউক প্রতি বছর গড়ে মাত্র ৪,১৭৫টি স্থাপনার অনুমোদন দিয়েছে, অর্থাৎ ৯৫.৩৬ শতাংশ স্থাপনাই অবৈধ। মিরপুর, মোহাম্মদপুর ও পল্লবী এলাকায় ৯৪.৭৬ শতাংশ ভবন অনুমোদিত পরিকল্পনা অনুযায়ী নির্মিত হয়নি। এই পরিসংখ্যান রাজউকের নজরদারির অভাব ও দুর্নীতির চিত্র তুলে ধরে।

বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, রাজউকের কর্মকর্তাদের দায় এড়িয়ে যাওয়ার সংস্কৃতি তৈরি হয়েছে। যেকোনো দুর্ঘটনা ঘটলে রাজউক ভবনটিকে অবৈধ বলে চিহ্নিত করে নিজেদের দায় এড়িয়ে যায়, কিন্তু যে কর্মকর্তারা অনুমোদন দেন বা পরিদর্শন করেন তাদের বিরুদ্ধে কোনো ব্যবস্থা নেওয়া হয় না।

জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের নগর ও আঞ্চলিক পরিকল্পনা বিভাগের একজন অধ্যাপক বলেছেন, একজন অনুমোদিত কর্মকর্তা ভবন সঠিকভাবে নির্মিত হচ্ছে কিনা তা নিশ্চিত করার জন্য বেতন পান, তাহলে তাদের এলাকায় অবৈধ ভবন গজালে তারা দায়ী নন কেন? তিনি আরও বলেন, দুর্নীতির প্রমাণ সবসময় পাওয়া যায় না, কিন্তু অবহেলার প্রমাণ অস্বীকার করা যায় না। মিরপুরের এই ভবনের ঘটনায় আইনগত পদক্ষেপের ক্ষেত্রে বেশ কিছু পথ খোলা আছে।

প্রথমত, রাজউককে অবিলম্বে এই ভবনের বিরুদ্ধে ৩বি ধারার নোটিশ জারি করে নির্মাণকাজ বন্ধ করতে হবে এবং মালিককে কারণ দর্শানোর নোটিশ দিতে হবে। যদি মালিক সন্তোষজনক জবাব দিতে ব্যর্থ হন, তবে রাজউক ভবনটি ভেঙে ফেলার নির্দেশ দিতে পারে। দ্বিতীয়ত, অকুপেন্সি সার্টিফিকেট ছাড়া ভবনে লোকজন উঠতে দেওয়ায় ভবন মালিকের বিরুদ্ধে ফৌজদারি মামলা করা যেতে পারে, কারণ এটি বসবাসকারীদের জীবন বিপন্ন করা।

তৃতীয়ত, রাজউকের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে তাদের দায়িত্বে অবহেলার অভিযোগে বিভাগীয় ব্যবস্থা এবং প্রয়োজনে ফৌজদারি মামলা করা যেতে পারে, কারণ তাদের অবহেলার কারণেই এই অবৈধ ভবনটি দাঁড়িয়ে আছে। চতুর্থত, নির্মাণ প্রতিষ্ঠান এ্যালায়েন্স বিল্ডার্স লিমিটেড ও ইমারত পরিদর্শক ফয়েজের বিরুদ্ধেও আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া যেতে পারে, কারণ তারা সচেতনভাবে আইন ভঙ্গ করে এই ভবনটি নির্মাণ ও পরিদর্শন করেছেন।

সার্বিকভাবে, মিরপুরের এই ছয়তলা ভবনটি বাংলাদেশের ভবন নির্মাণ আইন, বিএনবিসি এবং রাজউকের বিধিমালার একাধিক গুরুতর লঙ্ঘনের চিত্র তুলে ধরে। ভবন মালিক, নির্মাণ প্রতিষ্ঠান, ইমারত পরিদর্শক এবং রাজউকসহ সবারই এই ঘটনায় নিজ নিজ দায় রয়েছে।

রাজউকের অনুমোদন ছাড়া, ন্যূনতম খোলা জায়গা না রেখে এবং অকুপেন্সি সার্টিফিকেট ছাড়া এই ভবন নির্মাণ ও বসবাস করা হচ্ছে, যা শুধু আইন লঙ্ঘনই নয়, বরং বসবাসকারীদের জীবন নিয়ে ছিনিমিনি খেলা। রাজউকের দায়িত্বহীনতা ও নীরবতা এই অবৈধ নির্মাণকে আরও উৎসাহিত করছে, যা ঢাকার নগর পরিকল্পনা ও জননিরাপত্তার জন্য অত্যন্ত বিপজ্জনক।

আইনের চোখে সবাই সমান এবং দায়ী সবাইকেই আইনের আওতায় আনা প্রয়োজন, অন্যথায় এ ধরনের অবৈধ নির্মাণ বন্ধ হবে না এবং ভবিষ্যতে আরও বড় দুর্ঘটনার জন্য পথ প্রশস্ত হবে।


আপনার মতামত লিখুন :

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *