শুক্রবার, ১৫ মে ২০২৬, ০৭:৪২ অপরাহ্ন
পথচারী নির্মাণ শ্রমিকের জীবন ঝুঁকিতে: রাজউকের নজরদারির ঘাটতি স্পষ্ট
নার্গিস রুবি:
রাজধানীর দক্ষিণখান থানা এলাকার গাওয়াইর বাজারে রাজউক অনুমোদিত নকশা লঙ্ঘন করে অবৈধভাবে ভবন নির্মাণ চলছে—এমন অভিযোগ উঠেছে “হোমট্রাস্ট শিকদার গার্ডেন” নামের একটি ডেভেলপার কোম্পানির বিরুদ্ধে। রাজউকের জোনাল অফিস ২/১ এর আওতাধীন হোল্ডিং নং–২২৮, কাজী বাড়ি রোড, গাওয়াইর বাজার, দক্ষিণখান, ঢাকা ঠিকানায় ভবনটির ২ তলার ছাদ ঢালাইয়ের কাজ চলমান অবস্থায় সরেজমিনে গিয়ে দেখা যায়, নির্মাণ কার্যক্রমের সর্বত্রই নিয়ম লঙ্ঘন, নিরাপত্তাহীনতা ও অব্যবস্থাপনা বিরাজ করছে।
নিরাপত্তাহীনতায় শ্রমিক ও পথচারীরা:
পরিদর্শনে দেখা যায়, ভবনের চারপাশে নেই কোনো সেফটি নেট, সেফটি গার্ড কিংবা ঝুঁকি প্রতিরোধ ব্যবস্থা। শ্রমিকরা কোনো সুরক্ষা সামগ্রী ছাড়াই উচ্চতায় কাজ করছেন, ফলে যে কোনো মুহূর্তে বড় দুর্ঘটনা ঘটার আশঙ্কা রয়েছে। পথচারীরাও ঝুঁকির মধ্যে রয়েছেন, কারণ ছাদ থেকে ইট, বালু বা নির্মাণ সামগ্রী পড়ে মারাত্মক দুর্ঘটনা ঘটতে পারে।
বাংলাদেশ শ্রম আইন ২০০৬ (সংশোধিত ২০১৮) অনুযায়ী, নির্মাণস্থলে শ্রমিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করা বাধ্যতামূলক হলেও এ প্রকল্পে আইনটি স্পষ্টভাবে লঙ্ঘন করা হয়েছে।
নকশা থেকে ব্যাপক ডেভিয়েশন:
স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, ভবনটির বারান্দা ও ছাদ অংশে নির্ধারিত সেটব্যাক লঙ্ঘন করে অতিরিক্ত অংশ নির্মাণ করা হয়েছে। অনুমোদিত নকশায় যেখানে নির্দিষ্ট ফাঁকা জায়গা রাখার কথা, সেখানে ভবনের দেয়াল গেঁথে নির্মাণ কার্যক্রম এগিয়ে চলছে। ফলে পার্শ্ববর্তী ভবনের আলো-বাতাস ও নিরাপত্তাও বিঘ্নিত হচ্ছে।
রাজউকের জোন-২/১ অথরাইজ অফিসার হাসানুজ্জামান ও ইমারত পরিদর্শক সুব্রত তালুকদার বলেন,
“ডেভেলপারকে আমরা অনুমোদিত নকশা জমা দিতে বলেছি। নকশা দেখে যথাযথ ব্যবস্থা নেওয়া হবে।”
তবে রিপোর্ট লেখা পর্যন্ত রাজউকের পক্ষ থেকে কোনো কার্যকর পদক্ষেপ বা পরিদর্শন অভিযান শুরু হয়নি।
তথ্যসম্বলিত সাইনবোর্ড অনুপস্থিত:
রাজউক বিধি অনুযায়ী, প্রতিটি নির্মাণস্থলে অনুমোদিত নকশা, মালিক ও ডেভেলপারের তথ্যসহ সাইনবোর্ড প্রদর্শন বাধ্যতামূলক। কিন্তু সংশ্লিষ্ট ভবনটিতে কোনো তথ্যফলক পাওয়া যায়নি, যা নিয়মবহির্ভূত ও সন্দেহজনক কর্মকাণ্ডের ইঙ্গিত দেয়।
নির্মাণ বিশেষজ্ঞ ও নগর পরিকল্পনাবিদদের মতামত:
নগর পরিকল্পনাবিদ আর্কিটেক্ট আনিসুর রহমান বলেন,
“নকশাবহির্ভূত নির্মাণ শুধু একটি ভবনের সমস্যা নয়; এটি পুরো নগর পরিকল্পনার জন্য হুমকি। এতে ভবনের স্থায়িত্ব ও ভূমিকম্প প্রতিরোধ ক্ষমতা মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়।”
অন্যদিকে একজন সিনিয়র নির্মাণ বিশেষজ্ঞ মন্তব্য করেন,
“রাজউকের অভ্যন্তরীণ দুর্নীতি ও দুর্বল নজরদারি অব্যাহত থাকলে ঢাকা শহর অচিরেই বসবাসের অনুপযোগী হয়ে পড়বে।”
স্থানীয় বাসিন্দাদের ক্ষোভ ও দাবি:
স্থানীয় বাসিন্দারা জানিয়েছেন, নিয়ম বহির্ভূতভাবে নির্মাণ কাজ চললেও রাজউকের কোনো কর্মকর্তা এখনো কার্যকর পদক্ষেপ নেননি। এলাকাবাসীর দাবি—
১. অবিলম্বে অবৈধ নির্মাণকাজ বন্ধ করা;
২. একটি স্বাধীন তদন্ত কমিটি গঠন;
৩. দায়ীদের বিরুদ্ধে ফৌজদারি মামলা দায়ের;
৪. সংশ্লিষ্ট রাজউক কর্মকর্তাদের জবাবদিহির আওতায় আনা;
৫. স্বতন্ত্র পর্যবেক্ষণ দল গঠন ও নিয়মিত মনিটরিং নিশ্চিত করা।
একজন স্থানীয় বাসিন্দা ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন,
“এটি শুধু একটি ভবনের নকশা লঙ্ঘন নয়; বরং ঢাকার নগর ব্যবস্থাপনায় প্রাতিষ্ঠানিক দুর্নীতির জ্বলন্ত উদাহরণ।”
ডেভেলপার কোম্পানির নীরবতা:
এ রিপোর্ট লেখা পর্যন্ত হোমট্রাস্ট শিকদার গার্ডেন কর্তৃপক্ষের কোনো মন্তব্য পাওয়া যায়নি। সাংবাদিকরা তাদের সঙ্গে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করলেও তারা সাড়া দেননি।
আইন ও প্রশাসনিক দায়:
রাজউক আইন ও বিল্ডিং কনস্ট্রাকশন অ্যাক্ট অনুযায়ী, অনুমোদিত নকশা ব্যতীত বা নকশা লঙ্ঘন করে নির্মাণের শাস্তি সর্বোচ্চ কারাদণ্ড ও ভবন ভাঙার নির্দেশ পর্যন্ত হতে পারে। বিশেষজ্ঞদের মতে, এসব অনিয়মের দায় শুধু ডেভেলপারের নয়, বরং সংশ্লিষ্ট রাজউক কর্মকর্তারাও প্রশাসনিকভাবে দায়ী।
রাজধানীতে প্রতিনিয়ত নকশাবহির্ভূত ও অনুমোদনহীন নির্মাণ বাড়ছে। রাজউকের দুর্বল মনিটরিং, আইনি শৈথিল্য এবং প্রশাসনিক উদাসীনতার কারণে সাধারণ মানুষ যেমন ঝুঁকিতে পড়ছে, তেমনি ঢাকার পরিকল্পিত নগরায়ন মারাত্মক হুমকির মুখে পড়ছে।
নগর বিশেষজ্ঞদের মতে, এখনই যদি কঠোর আইন প্রয়োগ, স্বচ্ছ তদন্ত এবং জবাবদিহিমূলক ব্যবস্থা না নেওয়া হয়, তবে ঢাকায় বসবাস নিরাপদ থাকবে না—বরং এটি ধীরে ধীরে “অগোছালো কংক্রিটের জঙ্গল”-এ পরিণত হবে।