সোমবার, ০৬ জুলাই ২০২৬, ০৪:০৯ পূর্বাহ্ন

শিরোনামঃ
খাদেম নিয়ামুন নাসির আলাপ এর রোগ মুক্তি ও সুস্থতা কামনায় দেশবাসীর কাছে দোয়া চেয়েছন – আসাদুজ্জামান আসাদ তালুকদার সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সামনের সড়ক সংস্কারে বিএনপি নেতা – জাহাঙ্গীর আল আজাদ ফরাজী তৃণমূলে খেলাধুলার প্রসারে তারেক রহমানের উদ্যোগ প্রশংসনীয়: শহিদুজ্জামান কাকন স্ত্রী কবরে, স্বামী কারাগারে: শরণখোলায় গৃহবধূর মৃত্যুকে ঘিরে আত্মহত্যা প্ররোচনার মামলা চন্দনাইশ প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তার ভিডিও ভাইরাল নির্বাহী প্রকৌশলীর নির্দেশ উপেক্ষিত চন্দনাইশ দোহাজারীতে হাজারী টাওয়ারের সামনে সওজ বিভাগের জায়গায় লিফট স্থাপন কাজ চলমান স্কুলের ডিম খেয়ে ১১ শিক্ষার্থী অসুস্থ। সরকারি হসপিটালে চিকিৎসা না দিয়ে প্রাইভেট চিকিৎসা দেয়া নিয়ে জনগণের প্রশ্ন? ওয়ান চাইল্ড ওয়ান ট্রি বৃক্ষরোপন ২০২৬ ইং আমাদের প্রত্যয়, শিশুশ্রম আর নয়’! শরণখোলায় পল্লী বিদ্যুতের ‘ভুতুড়ে’ বিলে দিশেহারা গ্রাহক: রিডিং ছাড়াই মনগড়া বিলের অভিযোগ

রাজনীতির বিষাক্ত ছোবলে আমজনতা আজ অসুস্থ

 

আমরা প্রত্যেকেই জানি যে কোনো রাষ্ট্র হলো সংশ্লিষ্ট সমাজের সর্বোচ্চ রাজনৈতিক প্রতিষ্ঠান, যা সামাজিক মানুষদের সুস্থ জীবন যাপনের ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। নিশ্চয়ই প্রতিটি নাগরিকই রাষ্ট্রের সদস্য। রাষ্ট্র ছাড়া কোনো মানুষই তাঁর জীবনের অস্তিত্ব কল্পনাও করতে পারে না। তাই তো গ্রীক দার্শনিক এরিস্টটল বলেছেন, “মানুষ জন্মগতভাবে সামাজিক ও রাজনৈতিক জীব।” রাষ্ট্রের মধ্যে আমরা জন্মগ্রহণ করি, রাস্ট্রের আলো-বাতাসে বাঁচি এবং সাধারনত: রাস্ট্রের মধ্যেই শেষ নি:শ্বাস ত্যাগ করি। অতএব মানবজীবনের জন্য রাষ্ট্রের গুরুত্ব কেমন তা নতুন করে বলার প্রয়োজন নেই। আর রাস্ট্রের সুস্থতার জন্য প্রয়োজন অংশগ্রহণমূলক রাজনৈতিক পরিবেশ! রাস্ট্রবিজ্ঞানের নীতি অনুসারে, রাজনীতিতে সর্বসাধারনের প্রবেশাধিকারের সুযোগ রয়েছে। আর যে কোন দেশের রাজনীতি সেই দেশের আপামর জনসাধারন কে কেন্দ্র করে হয়ে থাকে। আমাদের দেশের রাজনীতিবিদদের লিখিত মতাদর্শও! কিন্তু বাস্তবতা একদমই ভিন্ন। রাজনীতিবিদেরা যেন আমজনতার মঙ্গলের চিন্তা বাদ দিয়ে ব্যক্তিগত স্বার্থ সিদ্ধিতে মহাব্যস্ত!রাশি রাশি মিথ্যা প্রতিশ্রুতি দিয়ে আমজনতার সাথে প্রতারণা করা হচ্ছে প্রতিটি মুহুর্তে! বাংলাদেশ নামক মানচিত্র সৃষ্টির সূচনা লগ্ন থেকেই এ দেশের রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট রীতিমত হতাশা জাগিনিয়া! মিথ্যার নীল নকশায় আচ্ছাদিত থেকেছে আমজনতার ভাগ্য! প্রতিনিয়িত নিরপরাধ, নিরপেক্ষ আর শান্তিকামী সাধারন মানুষ এই নির্লজ্জ ও ভয়ঙ্কর রাজনীতির শিকার হয়ে সর্বশান্ত হচ্ছে! নোংরা রাজনীতির করুণ পরিনতির শিকার অনেক শিক্ষার্থী অবেলায় পথভ্রষ্ট হয়ে যায় এ দেশে। অনেক স্বপ্নদ্রষ্টা অভিভাবক হতাশা, ক্ষোভ আর ঘৃণা নিয়ে না ফেরার দেশে পাড়ি জমাচ্ছে! স্বাধীনতা পরবর্তী ৫৫ বছরে রাজনীতির বিষাক্ত ছোবলে আমজনতা হাঁপিয়ে উঠেছে।

নিরপেক্ষভাবে রাজনৈতিক বিশ্লেষণ করলে দেখা যাবে ১৯৭১ সালের পর থেকে অদ্যাবধি এদেশের রাজনীতিতে সাধারন মানুষের কোন স্বত:ফুর্ত অংশগ্রহণ কিংবা সম্পৃক্ততার কোনো অনুকুল পরিবেশ চোখে পড়েনি। কখনো স্বৈরশাসন, কখনো নির্দিষ্ট মেয়াদের পরে নির্বাচন, কখনো প্রহসনমূলক নির্বাচন অনুষ্ঠিত হলেও গণমানুষের কন্ঠস্বরের কোনো তোয়াক্কাই করা হয়নি এ দেশে। অদৃশ্য অপশক্তির কষাঘাতে বারবার বিপন্ন হয়েছে সাধারন মানুষের নিরীহ জীবন। গণতান্ত্রিক শাসন ব্যবস্থার নামে যাবতীয় অপকর্মের সমাহার চলতে থাকে জনসংখ্যা বহুল এই ছোট্ট ভুখন্ডের বাংলাদেশ নামক দেশটিতে। ৭৩ বছর আগেই ছাত্র-কৃষক-মজুর মিলে ভাষার জন্য প্রাণ দিয়েছিল এই বাঙ্গালী জাতি! এর ঠিক দুই দশক পরেই আবার মুক্তিযুদ্ধে দল-মত-জাতি-ধর্ম-নির্বেশেষে ঝাঁপিয়ে পড়েছিল। শেষমেশ স্বাধীনতার মুকুট সত্যি সত্যিই ছিনিয়ে এনছিল। অনেক ত্যাগ তিতিক্ষার বিনিময়ে পাওয়া এ স্বাধীনতা কালক্রমে যেন মিথ্যা হিসেবে প্রমানিত হয়েছে। চোখের সামনেই অনাকাঙ্খিত ঘটনাসমূহ দেখে অবচেতন মনেই প্রশ্ন জাগে: “আদৌ কি এই দেশ স্বাধীন হয়েছে”? অথবা, রাজনীতির এই অশ্লীলতা- বর্বরতা দেখা্র জন্যই কি এত দামে কেনা এই স্বাধীনতা! স্বাধীনতা পরবর্তী ভন্ড-প্রতারক দিয়ে ভরে গেছে এ দেশের ভূ-খন্ড! এই দেশের জন্য শাহাদাত বরণ করা আত্নাগুলো আমাদের চারপাশে যখন এই রাজনীতির নিষ্ঠুর খেলা দেখে তখন কি আমাদের লজ্জা পাওয়া উচিৎ নয়? শুধুমাত্র সার্টিফিকেটধারী ভুয়া মুক্তিযোদ্ধার দল ও তাঁদের উত্তরসূরীগণ যখন রাস্ট্র থেকে সর্বোচ্চ সুবিধা নিতে ব্যস্ত, ঠিক সেই সময়ে নির্লোভ ও প্রকৃত মুক্তিযোদ্ধাগণ বর্তমানে জীবন যুদ্ধে নিজেকে সমর্পন করেছেন নতুনভাবে, নিদেন পক্ষে রিকশা চালিয়ে অথবা রক্ত পানি করা আরো কঠিন কোনো কাজে। বাংলাদেশের সংবিধানে সুস্পষ্টভাবে “জাতীয়তাবাদ, গণতন্ত্র, সমাজতন্ত্র ও ধর্ম নিরপেক্ষতা”- এই চারটি মূলনীতির কথা উল্লেখ থাকলেও বাস্তবে এর কোনো মিল খুঁজে পাওয়া যায়নি অনেক কষ্টের বিনিময়ে পাওয়া এই দেশটিতে। সত্যিকার অর্থে সংবিধানের মূলনীতিসমূহ কেবলমাত্র কাগেজে কলমে সীমাবদ্ধ। প্রায় ১৮ কোটি জনসংখ্যার এদেশে বাক-স্বাধীনতা নেই, ভোটাধিকার নেই, চলার স্বাধীনতা নেই, সামাজিক নিরাপত্তা নেই! এই দেশটিতে প্রতি বছর স্বাধীনতা দিবস, বিজয় দিবস, মানবাধিকার দিবস পালিত হয়। অথচ বাস্তবে কোথাও এর লেশমাত্র মিল খুঁজে পাওয়া যায় না। সরকারি কিংবা বেসরকারি সেবাদানকারী প্রতিষ্ঠান সমূহে কোনো স্বচ্ছতা-জবাবদিহিতা নেই! ন্যায্য কথা বলার মানুষ থাকলেও পেশীশক্তির কাছে নত হতে হয় প্রতিটি ক্ষেত্রে। আর এ সমস্ত অপকর্মসমূহ নিয়ন্ত্রন করে রাজনৈতিক মদতপুষ্ট ক্ষমতাধর ব্যক্তি, গোষ্ঠী বা প্রতিষ্ঠান সমূহ!

গণতন্ত্রকে পুঁজি করে যতো সহিংস, অহিংস, ধ্বংসাত্নক আন্দোলন হয়েছে, তার প্রত্যেকটার সুফল ভোগ করেছে রাজনৈতিক মদতপুষ্ট ক্ষমতাধর রাঘব বোয়ালেরা। আমজনতার ভাগ্যকে নিয়ে এদেশে প্রহসন চলে হরহামেশায়। আন্দোলন পরবর্তী সুফলভোগকারী রাজনৈতিক দলগুলো আমজনতাকে ফুটবলের মতো লাথি মারতেও দ্বিধা করেনা। প্রায় সকল রাজনৈতিক দলেরই চালচিত্র একই রকমের। বাংলাদেশের মতো একটি গণতান্ত্রিক দেশে কোনো রকম বাস্তবধর্মী উন্নয়ন পরিকল্পনা থাকবে না, এটি অত্যন্ত হাস্যকর ও দু:খজনক! এদেশের উন্নয়নের কেন্দ্রবিন্দুতে কখনোই অমজনতা্র গুরুত্ব ছিলনা যা একটি গণতান্ত্রিক দেশের বৈশিষ্ট্য হতে পারেনা! এক্ষেত্রে আম জনতার দায় থাকলেও সহিংস রাজনীতির জাঁতাকলে তা পিষ্ট হয়ে আসছে যুগের পরে যুগ। যার ফলশ্রুতিতে সাধারণ জনগন অসহায় দর্শকের মত দাড়িয়ে নির্লজ্জ রাজনীতিবিদদের তামাশা দেখে! তথাকথিত রাজনীতিবিদগণ তাদের ঘোষিত কর্মসূচী সাধারণ মানুষকে দিয়ে জোর করে মানাতে বাধ্য করে আসছে। খুবই দু:খজনক হলেও সত্যি যে, “গনতন্ত্র রক্ষার” নামে যেসব ভুয়া আন্দোলন হয়েছে তাঁর সিংহভাগ ক্ষয়ক্ষতির শিকার এদেশের আপামর জনগন। এ অবস্থা থেকে উত্তরনের উপায় কি? সাধারণ মানুষকে সাথে নিয়ে কে-ই পথ দেখাতে পারে এই কঠিন সময়ে?

আজ যখন আমরা একবিংশ শতাব্দীর রজত জয়ন্তী পার করছি, তখন উন্নত বিশ্বের সাথে তাল মিলিয়ে নানাবিধ উদ্ভাবনী উন্নয়নে ব্যস্ত থাকার কথা! অথচ আমরা এখন রাজনৈতিকভাবে চরম সঙ্কটময় অবস্থার মধ্যে পার করছি প্রতিটি মুহুর্ত! ছাত্রজনতার গণঅভ্যুত্থানে অনেক রক্তক্ষয়ী আন্দোলনের ফলে ২০২৪ সালে বিগত স্বৈরাচারী সরকারের পতনের পর বাংলাদেশে অভাবনীয় পরিবর্তনের সম্ভাবনা সৃষ্টি হলেও বাস্তবে যা ঘটছে তা নিতান্তই অপ্রত্যাশিত। সারা দেশের রাজনীতিতে ব্যপক পরিবর্তন ঘটলেও আম জনতার ভাগ্যের তেমন কোনো পরিবর্তন আসেনি। লাগামহীন দ্রব্যমূল্যের উর্ধ্বগতির সাথে পাল্লা দিয়ে চলছে অরাজকতা! অন্তর্বর্তীকালীন সরকারকে কাজ করার কোনো স্বাধীনতাই দেয়া হচ্ছেনা। অজানা কারণে পরবর্তী জাতীয় নির্বাচন নিয়ে প্রতিটি মহল চরম দুশ্চিন্তায় কাটাচ্ছে! একদল চায় নির্বাচন হোক, আরেক দল চায় নির্বাচন যত দেরী হয় ততই মঙ্গল! আবার একটি পক্ষ দেশের একটি বৃহৎ রাজনৈতিক দলের নিবন্ধন বাতিল করতে ব্যস্ত! অথচ, গঠনমূলক কোনো সিদ্ধান্ত গৃহীত হয়নি যাতে আমজনতার মঙ্গল নিহিত রয়েছে অথবা জাতীয় উন্নয়নের কোনো রুপরেখা তৈরী হয়েছে।এযই উদ্দেশ্যে এই অন্তর্বর্তীকালীন সরকারকে দায়িত্ব দেয়া হছিল, বাস্তবে তাঁরা আসলে কাজের কোনো অনুকূল পরিবেশই পাচ্ছেনা। একদিকে ঋণে জর্জরিত, তদুপরি রাজকোষ ফাঁকা হবার কারণে অল্প আয়ের শিক্ষকগণ সহ অন্যান্য পেশার চাকৃরীজীবিগণ অনেক মানবেতর জীবন পার করছেন। কেউ কেউ ২-৩ মাস, অনেকে আবার ৭-৮ মাস ধরে বেতন পাচ্ছেন না। প্রতিটি ক্ষেত্রেই রাজনৈতিক নেতাগণ তাদের স্বার্থ সিদ্ধি করতে ব্যস্ত থাকে আর এ্রর ভোগান্তির শিকার অতি সাধারন জনগণ।

আমাদের দেশের বর্তমান রাজনীতি এক দূরারোগ্য ব্যধিতে রুপ নিয়েছে। রাজনীতির বিষাক্ত ছোবলে আমজনতা আজ অসুস্থ! এখানে নেই কোন সততা, নেই কোনো আদর্শ, নেই কোন জনকল্যাণমুখী পরিকল্পনা। অপ্রিয় হলেও সত্যি যে, বর্তমানে রাজনীতিতে নীতি-নৈতিকতা একবোরেই বিলুপ্তপ্রায়। শুধু দূর্নীতি ও আত্মসাৎ এর এক অসুস্থ প্রতিযোগিতায় নেমেছে শিক্ষিত নামধারী জনগণ! অনৈতিক কর্মকান্ড ও পেশীশক্তিই হচ্ছে যাদের মূল চালিকাশক্তি। কিন্তু এই প্রিয় দেশটিকে বাঁচাতে হলে সকল রাজনীতিবিদদেরকে দেশপ্রেমের শপথ নিয়ে সর্বাগ্রে এক হয়ে কাজ করতে হবে। কেননা রাজনৈতিক ব্যক্তিদের হাতেই রয়েছে দেশ ও জাতির কল্যাণ, আগামী প্রজন্মের ভবিষ্যৎ এবং সুস্থ সমাজ গঠনের চাবি। রাজনীতি সুস্থ না হলে বৈষম্যের অভিশাপ থেকে কখনোই পরিত্রান পাবে না এ জাতি!

লেখক:
জান্নাতুল ফেরদৌস
সহকারী অধ্যাপক, রাস্ট্রবিজ্ঞান বিভাগ,
মুন্সিপাড়া আদর্শ কলেজ, বিরল, দিনাজপুর।


আপনার মতামত লিখুন :

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *