রবিবার, ২১ জুন ২০২৬, ০২:২৫ পূর্বাহ্ন
শরণখোলা (বাগেরহাট) প্রতিনিধি:
বাগেরহাটের শরণখোলা উপজেলায় মাদক নির্মূলে প্রশাসনের নিয়মিত অভিযান থাকলেও কমছে না মাদকের দৌরাত্ম্য। অভিযোগ রয়েছে— আইনের ফাঁকফোকর, নথিপত্রের দুর্বলতা এবং পুলিশের একাংশের যোগসাজশে বারবার জামিনে বেরিয়ে আসছে শীর্ষ মাদক কারবারিরা। কারাগার থেকে মুক্ত হয়ে তারা পুনরায় পুরোনো সিন্ডিকেট সক্রিয় করে তোলায় চরম হুমকিতে পড়েছে স্থানীয় জননিরাপত্তা। অন্যদিকে, মাদকের টাকা জোগাড় করতে গিয়ে এলাকায় চুরি ও ছিনতাইয়ের মতো অপরাধে জড়াচ্ছে মাদকাসক্তরা।
অনুসন্ধানে জানা যায়, উপজেলার একাধিক চিহ্নিত মাদক কারবারির বিরুদ্ধে ডজনখানেক মামলা থাকলেও তারা দ্রুতই আদালত থেকে জামিন পেয়ে যাচ্ছে। বাগেরহাট জেলা আদালতের তথ্য অনুযায়ী, রায়েন্দা ইউনিয়নের চিহ্নিত মাদক কারবারি আমিনুলের (৪৬) নামে অন্তত ১৩টি মাদক মামলা রয়েছে। কয়েকটি মামলায় সাজা হলেও উচ্চ আদালত থেকে জামিন নিয়ে সে বারবার একই পেশায় ফিরছে। রায়েন্দা বাজারের শীর্ষ ইয়াবা কারবারি ইলিয়াস তালুকদার (৪২) ২৫০ পিস ইয়াবাসহ গ্রেফতার হওয়ার মাত্র এক মাসের মাথায় জামিনে বেরিয়ে পুনরায় সিন্ডিকেট পরিচালনা করছে।
এছাড়াও ৫টি করে মামলার আসামি খোন্তাকাটা ইউনিয়নের ইয়াবা ডিলার সাল্লু (৩৮), পশ্চিম খাদা গ্রামের আলমগীর তালুকদার (৪০) ও লাখুরতলা গ্রামের হেলাল মীর (৪৩) এবং ১৬টি মাদক মামলার আসামি ধানসাগর ইউনিয়নের নলবুনিয়া গ্রামের সাইয়েদ শেখ ওরফে পঙ্কজ (৪৮) বর্তমানে জামিনের সুযোগ নিয়ে নির্বিঘ্নে কারবার চালিয়ে যাচ্ছে।
আইনি এই দুর্বলতার বিষয়ে বাগেরহাট নারী ও শিশু নির্যাতন দমন ট্রাইব্যুনালের পাবলিক প্রসিকিউটর (পিপি) ও সিনিয়র আইনজীবী এম এ অদুদ মুক্তা বলেন, “এক শ্রেণির আইনজীবী মামলার নথির দুর্বল তথ্য ও এজাহারের আইনি ফাঁকফোকর কাজে লাগিয়ে আসামিদের আইনি সুরক্ষা দিয়ে থাকেন। এছাড়া স্থানীয় প্রভাবশালী সিন্ডিকেটের ভয়ে সাধারণ মানুষ আদালতে সাক্ষী দিতে সাহস পান না। ফলে প্রসিকিউশন দুর্বল হয়ে পড়ে এবং অপরাধীরা এর পূর্ণ সুবিধা নেয়।”
এদিকে, মাদক কারবারিদের এই অপ্রতিরোধ্য হয়ে ওঠার পেছনে পুলিশের বিরুদ্ধে গুরুতর অভিযোগ তুলেছেন ২নং খোন্তাকাটা ইউনিয়ন বিএনপির সাধারণ সম্পাদক কবির তালুকদার। তিনি বলেন, “কিছু অসাধু পুলিশ কর্মকর্তা মাদক ব্যবসা নিয়ন্ত্রণ করেন। তারা প্রকৃত কারবারিদের কাছ থেকে তথ্য নিয়ে লোকদেখানো অভিযানে সাধারণ মাদকাসক্তদের গ্রেফতার করে মূল হোতাদের সুরক্ষা দেন।”
তিনি আরও অভিযোগ করেন, “মাঝেমধ্যে দুই-একজন শীর্ষ কারবারি গ্রেফতার হলেও পুলিশ ইচ্ছে করেই মামলার নথিপত্র এমনভাবে তৈরি করে, যাতে তারা দ্রুত জামিনে মুক্ত হতে পারে।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক মাদকসেবীও আক্ষেপ করে বলেন, “আমরা মাদক সেবন করি বলে পুলিশ আমাদের ধরে, কিন্তু মূল বিক্রেতারা ধরাছোঁয়ার বাইরেই থেকে যায়। এলাকায় বিক্রি বন্ধ না হলে আমাদের পক্ষেও মাদক ছাড়া সম্ভব হচ্ছে না।”
তবে পুলিশের বিরুদ্ধে ওঠা এসব অভিযোগের বিষয়ে শরণখোলা থানার অফিসার ইনচার্জ (ওসি) জানান, পুলিশ সর্বোচ্চ চেষ্টা চালিয়ে মাদক কারবারিদের আইনের আওতায় আনছে। কিন্তু সাক্ষী না পাওয়া বা আইনি মারপ্যাঁচে তারা জামিন পেয়ে যাচ্ছে। যারা জামিনে বেরিয়ে পুনরায় মাদক বিক্রি করছে, তাদের ওপর কঠোর নজরদারি রাখা হচ্ছে এবং বিশেষ অভিযান জোরদার করা হয়েছে।
মাদক পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে শরণখোলা উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) বলেন, “মাদকের বিরুদ্ধে উপজেলা প্রশাসনের ‘জিরো টলারেন্স’ নীতি অব্যাহত রয়েছে। তবে সমাজ থেকে মাদক নির্মূলে শুধু অভিযানই যথেষ্ট নয়; জনপ্রতিনিধি ও স্থানীয় সচেতন মহলের সক্রিয় অংশগ্রহণের কোনো বিকল্প নেই।”